ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৩ এএম
চলতি বছরের শুরুতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ হয়েছিল স্বর্ণের দাম। তবে বছরের দ্বিতীয় ভাগে এসে বিশ্ববাজারে মূল্যবান এই ধাতুর দাম কিছুটা কমার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
ফলে স্বর্ণের দাম নিয়ে এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে ভবিষ্যতে এটি আরও কমতে পারে কি না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বুধবার বিকেলে স্পট দরে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণ চার হাজার ৩৪৫ ডলারের আশপাশে লেনদেন হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় বিশ্ববাজারে বর্তমানে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দুই লাখ টাকার আশপাশে।
যদিও ২০২৬ সালের শুরুর দিকে মূল্যবান এই ধাতু, প্রতি ট্রয় আউন্স ইতিহাস সর্বোচ্চ- পাঁচ হাজার ৬০২ ডলারে পৌঁছেছিল।
বাংলাদেশেও চলতি বছরে ঘন ঘন ওঠানামা করলেও গত কয়েক সপ্তাহে স্বর্ণের দাম নিম্নমুখীই ছিল।
গত ২৪ জুলাই প্রতি ভরি দুই লাখ ২০ হাজারের ঘরে পৌঁছালেও (২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম) বুধবার কিছুটা বেড়ে দুই লাখ ৩২ হাজার টাকা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম সবসময়ই কিছুটা অস্থির। কারণ বৈশ্বিক নানা পরিস্থিতির সঙ্গে এর দাম ওঠানামার বিষয়টিও নির্ভরশীল।
ফলে এর মূল্য কতটা কমতে পারে কিংবা কতটা বাড়তে পারে সেটি আগেভাগেই ধারণা করা কঠিন।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান হাবীব বলছেন, বিশ্বব্যাপি বর্তমানে যে প্রেক্ষাপট বিরাজ করছে তাতে স্বর্ণের দাম ভবিষ্যতে আরও অস্থির হতে পারে।
তার মতে, ডলারের দামে বৃদ্ধি বা পতন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংক সুদের হার বাড়ানো বা কমানোর বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেবে তার প্রভাবও পড়বে স্বর্ণের বাজারে।
এছাড়া বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ হিসেবে স্বর্ণ মজুদের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে তার প্রভাবও স্বর্ণের বাজারে পড়েব বলেই মত, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন এর প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন।
তিনি বলেন, রাশিয়া রিজার্ভের গোল্ড সেল করছে, চীন গোল্ড কিনে প্রতি মাসে তার রিজার্ভ বাড়াচ্ছে, ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে ডলারের গ্রহণযোগ্যতা কমছে, এর সঙ্গে যুদ্ধ। অস্থির পরিবেশে সেইফ ইনভেস্ট হিসেবে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোও গোল্ড কিনছে। ফলে প্রতিদিনই আন্তর্জাতিক মার্কেট ওঠানামা করছে।

বিশ্ববাজারে কমছে কেন?
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে কয়েক মাস ধরেই পতন লক্ষ্য করা গেছে। যদিও যেভাবে দাম বেড়েছিল তার তুলনায় দাম কমার প্রবণতা কম।
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম গত ২৮ জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১.১ গ্রাম) স্বর্ণের দাম পাঁচ হাজার ৬০২ ডলারে পৌঁছেছিল। যেটি কমে বর্তমানে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে নেমে এসেছে।
এই দাম আরও কমতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই স্বর্ণের বাজার চাপে রয়েছে। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ফীতিতে।
এছাড়া অগাস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তার খরচ ও এর মূল সূচক চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ফলে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দীর্ঘ সময় ধরে সুদের হার চড়া রাখতে হতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, স্বর্ণের নিজস্ব কোনো সুদ নেই। কিন্তু বাজারে সুদের হার বাড়লে অন্যান্য লাভজনক সম্পদে আয় বেড়ে যায়, ফলে সোনা ধরে রাখার খরচ বা অপরচুনিটি কস্ট বাড়ে। এ কারণেই বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম এর বাজার বিশ্লেষক ফ্রাঙ্ক ওয়ালবাউম বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ফেডারেল রিজার্ভের কঠোর নীতি স্বর্ণের দাম নিচের দিকে নামাতে পারে, অন্যদিকে কোনো নমনীয় বার্তা সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনাকে কমিয়ে এই ধাতুর দাম পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া ব্যবসায়ীরা তেলের দাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
দুই একদিনের মধ্যে সুদ হারের বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত জানাবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বার্তার দিকে তাকিয়ে আছে স্বর্ণের বাজার।
এছাড়া সৌদি আরব ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল খালাস সাময়িকভাবে স্থগিত করার পর সরবরাহ ঝুঁকি নিয়েও হিসাব কষছেন অনেক বিনিয়োগকারী। ফলে চাহিদা কমায় দামও কিছুটা কমেছে।
এছাড়া, এই অস্থিরতার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ মজুদের কৌশল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের স্বর্ণ সরিয়ে নিচ্ছে বিশ্বের অনেক দেশ।
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিত করেছে যে তারা উত্তর আমেরিকা থেকে নিজেদের কয়েক টন স্বর্ণ সরিয়ে নিয়েছে। ব্যাংকটি বলেছে, এই স্থানান্তরের ফলে তারা ‘গুরুতর সংকটের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত’ থাকবে।
ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত মোট প্রায় ৩১৩ টন স্বর্ণের মধ্যে ৮৬ টন স্থানান্তর করেছে লন্ডন।
এছাড়া এ বছরের শুরুতে ফ্রান্সও ঘোষণা দেয় যে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ দেশে ফিরিয়ে এনেছে।
এরপর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে যে, এই দেশগুলো কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে? তারা কি সামনে কোনো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কার শঙ্কা করছে? এসব প্রশ্নের কারণে স্বর্ণে ব্যক্তি বিনিয়োগ ও চাহিদা কম।
অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণেই যে এমন হচ্ছে, সেটি অবশ্য মনে করেন না বিশ্লেষকরা। যদিও এই পদক্ষেপ স্পষ্টভাবেই এমন এক বিশ্বের প্রতিক্রিয়া, যা বর্তমানে অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত।
বাণিজ্য ও সামরিক সংঘাত দেশগুলোকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে এবং তাদের স্বর্ণ নিজ দেশের কাছাকাছি রাখতে উৎসাহিত করছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ কাভাতোনি বিবিসিকে বলেছেন, যুদ্ধ এবং বাণিজ্য উত্তেজনা এই সিদ্ধান্তগুলোর কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে, তবে সেটিই একমাত্র কারণ নয়।
তার মতে, মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং দ্রুত লেনদেন করা যায় এমন স্থানে স্বর্ণ রাখা, এসব বিষয়ও এখানে ভূমিকা রেখেছে।
জোসেফ কাভাতোনি বলেন, আমি মনে করি না যে কোনো আসন্ন বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তবে আমি মনে করি মানুষ এখন তাদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, সে বিষয়ে আরও ভালোভাবে অবগত হচ্ছে।

দাম কী আর কমবে?
বাংলাদেশে মাত্র দুই বছর আগেও স্বর্ণের ভরি ছিল এক লাখ টাকার ঘরে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম লাখের ঘরে পৌঁছায়।
এরপর থেকেই কেবল রেকর্ড ভেঙেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম তিন লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
গত কয়েকমাস ধরেই এর দাম ওঠানামার মধ্যে থাকলেও নিম্নমুখী প্রবণতাই দেখা গেছে। গত ২৪ জুলাই প্রতি ভরি (২২ ক্যারেট) স্বর্ণের দাম দুই লাখ ২০ হাজার টাকা হয়েছিল।
ফলে মূল্যবান এই ধাতুর দাম কি আরও কমতে পারে? নাকি আবারও বেড়ে রেকর্ড ভাঙবে?
অর্থনীতিবিদ এবং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, স্বর্ণের দাম বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে এখান থেকে আর খুব বেশি কমার সম্ভাবনা নেই।
তারা বলছেন, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও প্রকট হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে- ফলে মূল্যবান এই ধাতুর দাম ভবিষ্যতে আবারও বাড়বে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বছরে গড়ে এক হাজার টন স্বর্ণ সংগ্রহ করেছে। এর আগের দশকে এই গড় ছিল ৫০০ টন।
বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতির কারণে আগামী বছর এই পরিমাণ আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
গোল্ডম্যান স্যাকস-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম চার হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাবে, যা বর্তমান দামের তুলনায় ৩০০ ডলার বেশি।
অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদে ফেডের সুদের হার, তেলের দাম এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে স্বর্ণের দাম চাপে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মজুদ বাড়ানোর প্রবণতা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা স্বর্ণকে আবারও নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরে রাখবে।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান হাবীব বলছেন, গোল্ডকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবেই গণ্য করা হয়। যার ফলে রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে বিভিন্ন দেশ বা ব্যক্তি পর্যায়েও স্বর্ণ রাখা হয়।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যখন অনিশ্চয়তা থাকে তখন মানুষ স্বর্ণের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। যখনই স্বর্ণের দাম বেড়েছে, আপনি লক্ষ্য করবেন গ্লোবালি কারেন্সি রেইট, ইন্টারেস্ট রেইট, ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেটে অস্থিরতা খুব বেশি।
এই অর্থনীতিবিদ বলছেন, অর্থনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। ফলে দাম শিগগিরই আবারও বৃদ্ধি পাবে। এতে করে ব্যক্তি পর্যায়ে স্বর্ণে বিনিয়োগ কিছুটা কঠিনও হয়ে যেতে পারে। সূত্র: বিবিসি বাংলা
/এএস