জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫১ পিএম
উচ্চ সুদে ঋণ দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া এবং ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ওঠায় অনুমোদনহীন অনলাইন ঋণদানকারী মোবাইল অ্যাপগুলোর পেমেন্ট সেবা বন্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এসব অ্যাপ পরিচালনাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পেমেন্ট সেবা বন্ধে দেশের ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি)সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট থেকে সম্প্রতি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে তফসিলি ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও অনুমোদিত পিএসপি, এমএফএস সেবাদাতা এবং ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবা নগদকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
চিঠি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, এমএফএস ও পিএসপি প্রতিষ্ঠান এবং নগদকে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবহিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, দেশে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত কিছু মোবাইল অ্যাপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া গ্রাহকেরা উচ্চ সুদের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুধু উচ্চ সুদ আদায় নয়, এসব অ্যাপ ব্যবহারকারীদের মোবাইল ফোনে থাকা কনট্যাক্ট নম্বর, ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য, ছবি, ভিডিও এবং খুদে বার্তায় (এসএমএস) প্রবেশাধিকার পেতে পারে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋণগ্রহীতারা দাবিকৃত উচ্চ সুদসহ ঋণ পরিশোধে অস্বীকৃতি জানালে অ্যাপ পরিচালনাকারীরা তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ব্ল্যাকমেইল ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০২৪-এর ১৫(২) ধারা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো অনলাইন বা অফলাইন প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ সংগ্রহ, ঋণ প্রদান, অর্থ সংরক্ষণ বা আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। চিহ্নিত অ্যাপগুলো এ ধরনের অনুমোদন ছাড়াই ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করায় সেগুলোকে অবৈধ এবং আইনের ৩৭(১) ধারার অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এসব অবৈধ ঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেন সম্পন্ন করতে সহায়তা করা পেমেন্ট সেবা প্রদানকারীরাও ওই অপরাধের সঙ্গে জড়িত হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। এ কারণে আইনের ১৮(৪) ধারা অনুযায়ী চিহ্নিত মোবাইল অ্যাপগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের পেমেন্ট সেবা অবিলম্বে স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জনস্বার্থে এবং দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে এসব মোবাইল অ্যাপের বিরুদ্ধে কার্যকর জনসচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এ কাজগুলো আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকের না। তারপরও দেশ ও মানুষের প্রতারিত হওয়ার কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘মানুষকেও আরও সচেতন হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ঋণ বিতরণ হয় না, এটা মানুষের বুঝতে হবে। ঋণ প্রদান করে ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার এসব বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করে আসছে। কিন্তু তারপরও অনেকে এই প্রতারকদের ফাঁদে পড়ছে। তাই মানুষকেও সতর্ক থাকতে হবে।’
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আর্থিক সেবার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদনহীন ঋণদান, গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং ঋণ আদায়ের নামে হয়রানির অভিযোগও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে অবৈধ ঋণদাতা অ্যাপগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট সেবা বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগকে প্রতারণামূলক আর্থিক কার্যক্রম ঠেকানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টিএই/এএইচ