নিজস্ব প্রতিবেদক
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম
ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তিকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ৫৪ বছরের অপেক্ষার পর ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তার মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রসারণের পর ইস্টার্ন রিফাইনারির অপরিশোধিত জ্বালানি (ক্রুড) পরিশোধন ক্ষমতা বছরে ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ৩০ লাখ টন ক্রুড পরিশোধনের সক্ষমতা তৈরি হবে।

তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় ৬৮ লাখ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রি করেছে। বিপরীতে দেশের নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা ছিল ১৫ লাখ টন। বাকিটা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে পরিশোধিত অবস্থায় এসেছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়লে এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে বলে মনে করেন তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে ফয়েজ আহমদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ২০২৬ সালে ক্রুড জাহাজে করে আনার ক্ষেত্রে বাধার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এ কারণে পরিশোধিত তেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশয়াশি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয় তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন গ্রেডের ক্রুড পরিশোধনের সুযোগ তৈরি হবে এবং ইউরো-৫ মানের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হবে। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের ইউনিট-১ এর শান গ্রেডের ক্রুড পরিশোধন সক্ষমতা নাই।
পরিশোধন, প্রক্রিয়াকরণ ও লজিস্টিকসের মূল্য সংযোজন এতদিন বিদেশে থেকে যাচ্ছিল। এসব ভ্যালু এডিশন দেশে হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফয়েজ আহমদ বলেন, প্রকল্পটির কাজ ২০১৫ সালে শুরু হলেও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকল্প প্রস্তাব, ব্যয় সংশোধন, অর্থায়ন আলোচনা ও প্রশাসনিক বিলম্বসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এটি জাতীয় লজ্জার বিষয়।
তিনি আরও জানান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটির কারিগরি স্পেসিফিকেশন চূড়ান্ত হয় এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়। এরপর নির্বাচিত সরকার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ঋণ চুক্তি করেছে। এটিকে ইতিবাচক নজির হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
চলমান জ্বালানি সংকটে সরকার বদলালেই ফাইল আটকে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরুনোকে স্বাগত জানানো উচিত বলেও মন্তব্য করেন ফয়েজ আহমদ।
প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও কেন দ্বিতীয় বৃহৎ রাষ্ট্রীয় শোধনাগার হলো না? এই প্রকল্প নিজেই প্রায় ১৬ বছর ধরে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ব্যয় সংশোধন, অর্থায়ন আলোচনা ও প্রশাসনিক বিলম্বের চক্রে ঘুরেছে। আমাদের সমস্যা দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়প্রক্রিয়ার অদক্ষতা, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি। ঢাকা-চট্রগ্রাম হাইওয়ে, বন্দর রেল, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎসহ জাতীয় সক্ষমতার অপরাপর প্রকল্প গুলোকে এরকম দীর্ঘসূত্রতা থেকে বের করে আনতে হবে।
এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্প শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বলেন, ‘এখন অগ্রাধিকার দিতে হবে যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা যায় এবং সময়ক্ষেপণ করে ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ বন্ধ থাকে।
আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং স্বাধীনভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর সময়কে পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতা সূচক (কেপিআই) হিসেবে নির্ধারণেরও প্রস্তাব দেন ফয়েজ আহমদ।
একই সঙ্গে ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি ইতিবাচক হলেও এটি কনসেশনাল বা স্বল্পসুবিধার ঋণ নয় উল্লেখ করে অর্থায়নের ব্যয়, ঋণ পরিশোধের সময়সূচি, প্রকল্পের রিটার্ন এবং প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের তথ্য প্রকাশ্যে থাকা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
ফয়েজ আহমদের মতে, ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্প শুধু একটি শোধনাগার প্রকল্প নয়; এটি ডলার সাশ্রয়, জ্বালানি নিরাপত্তা, দেশে মূল্য সংযোজন এবং রাষ্ট্রীয় বাস্তবায়ন সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। চুক্তি স্বাক্ষরের দিনে নয়, বরং রিফাইনারি চালু হয়ে উৎপাদন শুরু করার পরই প্রকল্পটির প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এমআর