Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

তিন বছরে বন্ধ ৪০০ পোশাক কারখানা, ব্যয় বেড়েছে ৪০ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৩ পিএম

জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রফতানি আদেশ কমে যাওয়ায় দেশের তৈরি পোশাকশিল্প কঠিন সময় পার করছে। গত তিন বছরে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অর্ডার সংকট সামাল দিতে না পেরে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। একই সময়ে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধিরা। সাক্ষাতে পোশাকশিল্পের বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বিজিএমইএর পক্ষ থেকে জানানো হয়, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করতে পারছে। এতে নির্ধারিত সময়ে রফতানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নতুন অর্ডার হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।

সংগঠনটির হিসাবে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং মজুরি সমন্বয়ের কারণে গত তিন বছরে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এর সঙ্গে রফতানি আদেশ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা টিকে থাকতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে।

বিজিএমইএ জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসেও পোশাক রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা পণ্যের দামে সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কারখানাগুলোর মুনাফার সুযোগ কমছে। দীর্ঘদিন ধরে এই চাপ চলতে থাকায় অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

image

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দ্রুত আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের সুপারিশ করেছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির মতে, নতুন টার্মিনাল যুক্ত হলে আমদানি করা এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখা এবং এলএনজি আমদানির পর্যায়ে শুল্ক-কর প্রত্যাহারেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলোর জন্যও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। ১৫০ থেকে ৫০০ কেজি বয়লার রয়েছে এমন কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত গ্যাস সংযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে দীর্ঘমেয়াদি কম সুদের বিশেষ ঋণ সুবিধার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

পোশাক রফতানির পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়নেও বিভিন্ন সুপারিশ করেছে বিজিএমইএ। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বড় কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি রয়েছে।

এ ছাড়া চলতি মূলধন ও বাণিজ্যঋণের সুদের হার কমানো এবং পোশাক খাতের জন্য বিশেষ পোস্ট-শিপমেন্ট অর্থায়ন সুবিধা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড ও প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিলে বরাদ্দ বাড়ানোরও সুপারিশ করা হয়েছে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ধরে রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। পাশাপাশি প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির উদ্যোগ দ্রুত নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

বিজিএমইএ নেতারা মনে করেন, পোশাকশিল্পের বর্তমান সংকট দ্রুত মোকাবিলা করা না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে কারখানা বন্ধের কারণে কর্মসংস্থানেও চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাক্ষাতে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল শিল্পের সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে। এর মধ্যে এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করা, নিষ্ক্রিয় ও বন্ধ পোশাক কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা এবং নন-বন্ডেড কারখানার জন্য বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরাসরি রফতানির সুযোগ সহজ করার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিজিএমইএ নেতাদের বক্তব্য শোনেন। তিনি তৈরি পোশাকশিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে উল্লেখ করেন। সাময়িক প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের অবস্থান ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন রাষ্ট্রপতি।

এএইচ/এআর