Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ৭৩ টন ডুপ্লেক্স বোর্ড নয়াবাজারে, ১০ ট্রাক জব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম

বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা প্রায় ৭৩ মেট্রিক টন ডুপ্লেক্স বোর্ড খুলনায় নির্ধারিত গন্তব্যে না নিয়ে পুরান ঢাকার নয়াবাজারে নেওয়ার অভিযোগে ১০টি ট্রাক আটক করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। আটক ট্রাকগুলোর মধ্যে ৯টিতে ডুপ্লেক্স বোর্ড এবং অপরটিতে শনাক্ত করা যায়নি এমন পণ্য রয়েছে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানানো হয়।

সিআইআইডি জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৮ আগস্ট দিবাগত রাতে পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ভারতের মেহালি পেপারস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে খুলনার শ্রী ফ্লেক্সোপ্যাক লিমিটেডের নামে আমদানি করা এসব পণ্যের নির্ধারিত গন্তব্য ছিল খুলনার একটি বন্ডেড প্রতিষ্ঠান। তবে ট্রাকগুলো নির্ধারিত পথে না গিয়ে পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকায় প্রবেশ করে।

গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সিআইআইডির অতিরিক্ত মহাপরিচালক-১-এর নেতৃত্বে একটি দল বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। অভিযানে র‌্যাব-১০ ও পুলিশের লালবাগ বিভাগও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে। পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়।

সিআইআইডির উপস্থিতি টের পেয়ে নয়াবাজারমুখী ট্রাকবহরের একটি ট্রাক দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। অন্যদিকে নয়াবাজারে আগে থেকেই অবস্থান করা এবং পণ্য বিক্রির প্রস্তুতিতে থাকা আরও একটি ট্রাক শনাক্ত করে আটক করা হয়। সব মিলিয়ে অভিযানস্থলে ১০টি পণ্যবোঝাই ট্রাক সিআইআইডির নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হয়। পালিয়ে যাওয়া ট্রাকটি শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে।

সিআইআইডি জানিয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে খুলনাগামী পণ্যবাহী যানবাহনের প্রচলিত বাইপাস রুট হলো কাঁচপুর, সাইনবোর্ড, পোস্তগোলা, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতু হয়ে খুলনা। এই রুটে ঢাকার মূল শহর এড়িয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে যাওয়া যায়।

অন্যদিকে পুরান ঢাকার নয়াবাজার, রায়সাহেব বাজার ও তাঁতীবাজার খুলনাগামী স্বাভাবিক পরিবহনপথের বাইরে এবং বিপরীত দিকে অবস্থিত ঘনবসতিপূর্ণ পাইকারি বাণিজ্যিক এলাকা। ফলে খুলনাগামী বন্ডেড পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলোর নির্ধারিত রুট ছেড়ে নয়াবাজারে প্রবেশের বিষয়টি গোপন সংবাদের প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণ করেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

সিআইআইডি আরও জানিয়েছে, নয়াবাজারের একটি আড়তে বন্ডেড পণ্য বিক্রির চেষ্টা চলছিল বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে ওই প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।

বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাঁচামাল সংশ্লিষ্ট বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত কারখানা বা গুদামে নিয়ে উৎপাদন কাজে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া এসব পণ্য অন্য গুদাম বা আড়তে নেওয়া, খোলাবাজারে খালাস, বিক্রি বা হস্তান্তর কিংবা অনুমোদিত উৎপাদন কার্যক্রমের বাইরে ব্যবহার করা হলে তা বন্ড সুবিধার শর্ত লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় সরকারের শুল্ক-কর রাজস্ব ফাঁকির ঝুঁকিও তৈরি হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায় চূড়ান্ত তদন্ত, নথি যাচাই এবং তাদের বক্তব্য গ্রহণের পর নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে সিআইআইডি।

আটক ট্রাক ও পণ্য নিয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা। প্রতিটি ট্রাকের নিবন্ধন ও মালিকানা, ট্রাকপ্রতি পণ্যের পরিমাণ ও প্যাকেজ, কনটেইনার ও পরিবহন সিলের অখণ্ডতা এবং আমদানি-পরিবহনসংক্রান্ত নথি যাচাই করা হচ্ছে।

এ ছাড়া বিল অব এন্ট্রি, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, পরিবহন চালান, বন্ড লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট ইউটিলাইজেশন পারমিশনও পরীক্ষা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে ট্রাকগুলো কখন ছেড়েছে, কখন ঢাকায় পৌঁছেছে এবং নয়াবাজারের কোন আড়ত বা ব্যবসায়ীর কাছে পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পরিবহনকারী, সম্ভাব্য ক্রেতা ও আড়তদারদের ভূমিকা এবং এর আগে একই পদ্ধতিতে বন্ডেড পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য শুল্ক-কর ফাঁকির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, পণ্যগুলো ভারতের মেহালি পেপারস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে খুলনার শ্রী ফ্লেক্সোপ্যাক লিমিটেডের নামে আমদানি করা হয়। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্যগুলোর শুল্কায়ন করা হয়েছে। এর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এম এ আজাদ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড এবং পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান ডেল্টা ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস।

আটক পণ্য ও ট্রাকগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত, পণ্যের পরিমাণ নিরূপণ এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের কাজ চলছে। তদন্তে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, গন্তব্য পরিবর্তন, অবৈধভাবে পণ্য খালাস বা খোলাবাজারে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত কাস্টমস ও বন্ডসংক্রান্ত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাশাপাশি পালিয়ে যাওয়া ট্রাকটি শনাক্ত, সম্ভাব্য ক্রেতা ও আড়তদারদের চিহ্নিত এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুরো চক্র উদ্ঘাটনে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

এমআর/এম/এমআই