জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম
কৃষি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগের অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা বা ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
একইসঙ্গে প্রান্তিক ও প্রকৃত কৃষকের হাতে সময়মতো ঋণ পৌঁছানো এবং ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান কৃষি ঋণের নতুন লক্ষ্যমাত্রা ও নীতিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
নতুন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ২০ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ৩৯ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
ড. হাবিবুর রহমান বলেন, জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান বিবেচনায় মোট ঋণের মধ্যে কৃষি ঋণের অংশ বর্তমানে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণে কৃষি ঋণের অংশ মোট ঋণের আড়াই শতাংশ থেকে বাড়িয়ে চার শতাংশ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ অংশ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষিকে স্বনির্ভর এবং কৃষককে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করাই কৃষি ঋণ বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য। কৃষক ঋণ নিয়ে উৎপাদন বাড়াবেন, সময়মতো ঋণ পরিশোধ করবেন এবং পরবর্তী সময়ে আরও বড় ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবেন—এটাই নীতিমালার লক্ষ্য।
কৃষি ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ডেপুটি গভর্নর বলেন, সঠিক সময়ে প্রকৃত কৃষকের হাতে ঋণ পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ প্রকৃত কৃষক না হয়েও কৃষি ঋণ পেলে সেই অর্থ ভিন্ন খাতে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এমনকি এর অপব্যবহারকে অর্থপাচারের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা যেতে পারে।
তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কৃষক কার্ডধারীদের ঋণ দেওয়া তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবে কৃষক কার্ড না থাকলে ব্যাংককে যাচাই করতে হবে ঋণগ্রহীতা প্রকৃত কৃষক কি না। যাচাই না করে ঋণ দেওয়া হলে এর দায়ভার ব্যাংককেই নিতে হবে।
কৃষি ঋণ বিতরণে মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে ড. হাবিবুর রহমান বলেন, প্রকৃত কৃষকের হাতে ঋণ পৌঁছাচ্ছে কি না এবং ঋণের অর্থ যথাযথ কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত জরিপ ও পর্যবেক্ষণ করে। এ ক্ষেত্রে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।
কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ বিতরণে পুরনো ঋণ সমন্বয় করে নতুন ঋণ দেওয়ার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আগের ঋণ পরিশোধের পর কৃষকের প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়ানো হলে সেটিকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই না করে দীর্ঘদিন একই ঋণ বারবার নবায়ন করা হলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
ঋণ দেওয়ার পর অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করে কৃষক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা অর্জন করেছেন কি না, সেটিও ব্যাংককে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ঋণ বিতরণের শুরু থেকেই এর ব্যবহার ও পরিশোধ সক্ষমতার ওপর নজর রাখতে হবে।
নতুন নীতিমালায় অঞ্চলভেদে কৃষির ধরন ও চাহিদা বিবেচনায় ঋণ বিতরণে ‘এরিয়া অ্যাপ্রোচ’ পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের ক্রপ জোনিং, ‘খামারি’ অ্যাপস এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও মৎস্য অধিদফতরের তথ্য ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ক্রপ জোনিংয়ের তথ্য ব্যবহার করে অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন ও ঋণের চাহিদা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
ড. হাবিবুর রহমান বলেন, কোনো এলাকায় ধান, কোথাও আলু, আবার কোথাও মাছ বা অন্য কৃষিপণ্য বেশি উৎপাদিত হলে সে অনুযায়ী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। জমির পরিমাণ, উৎপাদন, সার, বীজ, শ্রমিক ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ঋণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাজারদর ও উৎপাদন ব্যয়ের সামঞ্জস্য বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণের সীমা বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ থাকবে।
নতুন নীতিমালায় নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ এবং বিকল্প জামানত ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ঋণ বিতরণ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ আবেদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু চার্জ ডকুমেন্ট ছাড়া অন্য কোনো চার্জ ডকুমেন্ট গ্রহণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জমি বা স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও দলগত জামানত ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের বিভিন্ন উৎপাদন কার্যক্রমকে ঋণের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন, হ্যাচারি, মাছের পোনা উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে একক বা দলবদ্ধ কৃষক ও খামারিকে ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, চুক্তিভিত্তিক কৃষি, নতুন ফসলের উৎপাদন এবং কৃষিপণ্যের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন কর্মসূচিতে ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল-সংক্রান্ত নীতিমালার সারসংক্ষেপ যুক্ত করা হয়েছে। ক্ষুদ্র মূলধনের কৃষক, নতুন উদ্যোক্তা ও নির্দিষ্ট উৎপাদন খাতকে ঋণের আওতায় আনতে বিভিন্ন সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
ডেপুটি গভর্নর বলেন, কৃষি ও পল্লী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর উদ্দেশ্য শুধু ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি নয়; প্রকৃত কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছানো এবং উৎপাদনশীল কাজে এর ব্যবহার নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। কৃষি ঋণ বিতরণে কোনো ব্যত্যয় যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃত কৃষক শনাক্তকরণ, ঋণের সঠিক ব্যবহার এবং সময়মতো ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব টিম বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে। কৃষি ঋণ বিতরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
টিএই/এএইচ