Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

‘অর্থনীতি-জ্বালানি-বেকারত্বে অগ্রগতি নেই’, জেডিপির ৬ অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৪ এএম

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে ছয়টি বড় ব্যর্থতা চিহ্নিত করেছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। দলটির অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের রাজনীতি বন্ধ, অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বেকারত্ব দূরীকরণে সরকার প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।

বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘জেডিপির চোখে ৬ মাসে বিএনপি সরকারের শীর্ষ ৬ ব্যর্থতা ও আমাদের প্রস্তাবনা’ শীর্ষক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন দলটির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে সরকারের কয়েকটি ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরে জেডিপি। দলটির মতে, নিষিদ্ধ নয় এমন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদের মতপ্রকাশের সুযোগ অব্যাহত রাখা, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের পথ বন্ধ রাখা, শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া, সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লটের সুবিধা বাতিলের উদ্যোগ এবং সরকারি কর্মচারীদের সকাল ৯টার মধ্যে কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ ইতিবাচক। 

তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের ছয়টি বড় ব্যর্থতা তুলে ধরে দলটি।

জেডিপির অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অনেক আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে সংসদ অধিবেশন বসার ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়া এবং উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছে দলটি।

এ ক্ষেত্রে অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে জেডিপি।

দ্বিতীয় ব্যর্থতা হিসেবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফের সন্ত্রাস ও সংঘাতের রাজনীতি ফিরে আসার কথা বলেছে জেডিপি।

দলটির দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষাঙ্গনে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা তৈরি হলেও পরে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। কুয়েটের পর সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘাতের মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের রাজনীতি ফিরে আসছে বলে মনে করে দলটি।

সংঘাতে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিকে ছাত্র সংসদকেন্দ্রিক করা এবং উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রস্তাব দিয়েছে জেডিপি।

তৃতীয় ব্যর্থতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে যথাযথ আলোচনা না হওয়ার অভিযোগ করেছে দলটি।

জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ বলেন, অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে গোপনীয়তার অভিযোগ উঠেছে। নতুন সরকার যেন একই ধারায় না হাঁটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও আলোচনার দাবি জানিয়েছে দলটি।

অর্থনীতির সংকট কাটাতে সরকার এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেছে জেডিপি।

দলটির দাবি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে দক্ষ ও পেশাদারদের মাধ্যমে পরিচালনার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের সংকট, খেলাপি ঋণ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা।

জেডিপির প্রস্তাব, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদারদের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত এনে সহজ শর্তে দরিদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে দলটি।

দেশের গ্যাস, তেল ও বিদ্যুৎ সংকটের কথা তুলে ধরে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছে জেডিপি।

দলটির প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকারি প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অন্তত ৯০ দিনের তেল মজুতের সক্ষমতা তৈরি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ এবং কয়লা উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগ।

একই সঙ্গে জ্বালানি খাতকে কোনো সিন্ডিকেট বা করপোরেট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।

ষষ্ঠ ব্যর্থতা হিসেবে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া বেকার ভাতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে জেডিপি। একই সঙ্গে এক বছরের মধ্যে দেড় কোটি বেকার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি বলে দাবি করেছে দলটি।

শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মসংস্থানমুখী করার ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জেডিপি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়ে বাজেটে সুস্পষ্ট রূপরেখা না থাকার কথাও তুলে ধরেছে তারা।

এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর আদলে ‘কো-অপারেটিভ এডুকেশন’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে জেডিপি। পাশাপাশি বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ভাষাশিক্ষার ব্যবস্থা, নতুন শিল্প স্থাপন এবং শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে দলটি।

এ ছাড়া শিক্ষিত বেকারদের কৃষিকাজে যুক্ত করা এবং কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছে জেডিপি।

ছয়টি প্রধান ব্যর্থতার পাশাপাশি জুলাই গণহত্যার বিচার দ্রুত না করা, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সংঘাত ও হতাহতের ঘটনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়া, মাজারে হামলা, নারী ও শিশুদের ওপর নিপীড়ন বন্ধে ব্যর্থতা এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেছে দলটি।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে নাঈম আহমাদ বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধিতা মানে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের বিরোধিতা করা নয়। জনগণের স্বার্থে সরকার ভালো কিছু করলে তার প্রশংসা করা এবং ভুল হলে সমালোচনা করা দায়িত্বশীল রাজনীতির অংশ।

তিনি বলেন, জেডিপির সমালোচনাগুলোকে রাজনৈতিক বিরোধিতা হিসেবে না দেখে জনস্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে তারা প্রত্যাশা করেন।

এমআর/এএইচ