Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

সম্পর্ক জোরদারে নিউজিল্যান্ডের কাছে বাংলাদেশের ৩ প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম

নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছে বাংলাদেশ। বৈঠকে আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (আরসিইপি), স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) উত্তরণ এবং দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা হয়।

সোমবার (১০ আগস্ট) ওয়েলিংটনে এমএফটির সদর দফতরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ তিনটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত প্রস্তাব উপস্থাপন করে। এগুলো হলো, আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ ও পরবর্তী বাজার সুবিধা নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গ্রুপ গঠন, এফটিএ আলোচনার জন্য যৌথ কর্মদল গঠন এবং এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময়ের আবেদনে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন নিশ্চিত করতে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদার করা।

বৈঠকে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির বাণিজ্য আলোচনা ও নীতি বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক সারা মেম্যান্ড এবং ইউনিট ব্যবস্থাপক জোনাস হোল্যান্ড। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান। প্রতিনিধিদলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ওয়েলিংটনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর ইশতিয়াক আহমেদ ছিলেন।

বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ সরকারের ও বাণিজ্যমন্ত্রীর শুভেচ্ছা নিউজিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় ভূমিকার প্রশংসা করে দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আরসিইপিতে সদস্যপদে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চায় বাংলাদেশ
বৈঠকে অন্যতম প্রধান আলোচ্য ছিল আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলীর বিস্তারিত জবাব ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আরসিইপির উচ্চমানের বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এর মধ্যে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও লজিস্টিকস খাতকে আরও উন্মুক্ত করা এবং প্রতিযোগিতা, পেটেন্ট, কপিরাইট ও তথ্য সুরক্ষা বিষয়ে আধুনিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়গুলো রয়েছে।

আরসিইপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিউজিল্যান্ডের নীতিগত প্রভাবের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশের সদস্যপদের পক্ষে দেশটির সক্রিয় সমর্থন চাওয়া হয়। পাশাপাশি সংবেদনশীল পণ্য ও শিল্প খাতের সুরক্ষায় আসিয়ানের এলডিসি সদস্যদের মতো ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি পর্যায়ক্রমিক শুল্ক নমনীয়তার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও তুলে ধরে বাংলাদেশ।

এলডিসি উত্তরণে ২০২৯ পর্যন্ত সময় চায় বাংলাদেশ
বৈঠকে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়। ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়সীমার পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণকাল বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে করা আবেদনের পক্ষে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে উন্নয়নশীল ও উত্তরণপ্রক্রিয়ায় থাকা অর্থনীতিগুলো চাপে রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তর, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশ জানায়, এলডিসি উত্তরণ অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার কোনো অভিপ্রায় নেই। বরং অতিরিক্ত সময়কে টেকসই ও সুসংগঠিত জাতীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতির জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।

নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে এফটিএ চায় বাংলাদেশ
বৈঠকে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ১৪তম মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলন সামনে রেখে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনার ধারাবাহিকতায় এফটিএ আলোচনার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধিদের জানায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, এফটিএ বাস্তবায়িত হলে নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের বড় ভোক্তা বাজারে দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ধাতব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিউজিল্যান্ডের বাজারে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

বাংলাদেশের মতে, ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি এফটিএ দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

যে ৩ প্রস্তাব দিল বাংলাদেশ
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও গতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ।
প্রথমত, আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ-পরবর্তী বাজার সুবিধা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য একটি বার্ষিক ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

দ্বিতীয়ত, এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রথম ধাপ হিসেবে দুই দেশের সমন্বয়ে একটি যৌথ কর্মদল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময়ের আবেদনের প্রতি নিউজিল্যান্ডের সমর্থন নিশ্চিত করতে নিউইয়র্কে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আশা প্রকাশ করে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ, বাজার সম্প্রসারণ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা পাবে।

বৈঠকে উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও উচ্চপর্যায়ের নীতি-সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল শিগগিরই নিউজিল্যান্ডের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানায়। নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ এ আমন্ত্রণে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে।

এমআর/এমআই