Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

দ্রব্যমূল্যে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে নগর আড়তদারদের ওপর নির্ভরতা: সিপিডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

দেশের খাদ্যপণ্যের বাজারে নগর আড়তদারদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাজার মূল্যে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বড় একটি অংশের সরবরাহ নগর আড়তদারদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় বাজারে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ তৈরি হচ্ছে। এতে দরকষাকষির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, প্রতিযোগিতা কমছে এবং সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন বা মজুতদারির ঘটনাও দ্রুত খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন অডিটোরিয়ামে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন: মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংলাপে গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী (সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট) ফকরুদ্দিন আল কবীর। গবেষণায় দেশের ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল, উৎপাদন ব্যয়, বিপণন ব্যয়, মূল্য সংযোজন এবং বাজারের বিভিন্ন স্তরের মার্জিন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। 

গবেষণায় বলা হয়, চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ, বেগুন, ডিম, রুই মাছ, ব্রয়লার মুরগি ও গরুর মাংসের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০টি পণ্যের মধ্যে ছয়টির ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা প্রধানত নগর আড়তদারদের কাছ থেকেই পণ্য সংগ্রহ করেন। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ, বেগুন, ডিম ও রুই মাছ। ফলে কয়েকটি নির্দিষ্ট আড়ত বা সরবরাহকারীর ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে এবং দামের ওপর অল্পসংখ্যক ব্যবসায়ীর প্রভাব বাড়ছে। এই পর্যায়ে সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, মজুতদারি বা যোগসাজশের ঘটনা ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে পড়ে।

সিপিডি বলছে, সরবরাহ শৃঙ্খল যত দীর্ঘ, খামার বা উৎপাদন পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হারও তত বেশি। বিশেষ করে কাঁচামরিচের ক্ষেত্রে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দাম বেড়েছে ১১৬ শতাংশ, যা বিশ্লেষণ করা পণ্যগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া মাঝারি পাইজাম চালে ১০০ শতাংশ, দেশি পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ এবং আলুতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ডিম, মুরগি, গরুর মাংস ও রুই মাছের মতো তুলনামূলক ছোট সরবরাহ শৃঙ্খলের পণ্যে মূল্যবৃদ্ধির হারও কম।

গবেষণায় বলা হয়েছে, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের প্রধান কারণ হিসেবে উত্তরদাতারা সরবরাহ সংকটকে চিহ্নিত করেছেন। এর পরেই রয়েছে ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ এবং মজুতদারি। তবে বাজারে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিটি স্তরের ব্যবসায়ী নিজেদের পরবর্তী স্তরের ব্যবসায়ীদের দায়ী করেছেন। অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভোক্তারা। অন্যদিকে উচ্চ উৎপাদক মূল্য মানেই কৃষকের বেশি লাভ নয়। উৎপাদন ব্যয়, শ্রম, সার, পরিবহন, পশুখাদ্য ও ওষুধের ব্যয় বিবেচনায় নিলে অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, পেঁয়াজ, বেগুন, কাঁচা মরিচ, মাছ ও গরুর মাংসের বাজারে বিভিন্ন স্তরে কমিশনভিত্তিক লেনদেনের প্রচলন রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষক, মিলার, নগর আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতারা ভোক্তার ব্যয়ের বড় অংশ মোট মার্জিন হিসেবে গ্রহণ করেন। পাশাপাশি কাঁচা মরিচ ও বেগুনের বাজারে মূল্য ওঠানামার হার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এসব পণ্যের বাজারে অস্থিরতাও বেশি।

Fakruddin
সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফকরুদ্দিন আল কবীর

বাজার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সাতটি সুপারিশ দিয়েছে সিপিডি। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে সরবরাহ শৃঙ্খলের অপ্রয়োজনীয় স্তর কমানো, পাইকারি বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য বিকল্প ক্রেতা ও সরবরাহকারী তৈরি, নিয়মিত উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা মূল্য প্রকাশ, বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আধুনিক সংরক্ষণ ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। এ ছাড়া কাঁচা মরিচের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় আড়তদার স্তর কমানো, পেঁয়াজে মজুতদারি কঠোরভাবে নজরদারি, আলুতে বিকল্প বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ডিম ও মুরগির ক্ষেত্রে পশুখাদ্য ও টিকার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুপারিশও করা হয়েছে।

সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফকরুদ্দিন আল কবীর বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি মানেই যে খাদ্যপণ্যের দাম বেশি হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে বাজারে উচ্চ মার্জিন থাকলেই অতিরিক্ত মুনাফা হচ্ছে বা বাজারে ঘনত্ব থাকলেই যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাও এই গবেষণা প্রতিষ্ঠা করে না। বরং খাদ্যপণ্যের মূল্য নির্ধারণে উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ পরিস্থিতি, পরিবহন, বাজার কাঠামো এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্মিলিতভাবে কাজ করে। তাই ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা এবং উৎপাদকের টেকসই আয় নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও সরবরাহ অবকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মুরগি ও গরুর মাংস উৎপাদনে খামারিদের নিট বিপণন মার্জিন ঋণাত্মক। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রকৃত লাভ করতে পারছেন না। বিশেষ করে পশুখাদ্য ও পশুচিকিৎসা ব্যয় তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে সরবরাহ শৃঙ্খলের পরবর্তী ধাপে থাকা ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক বেশি মার্জিন পাচ্ছেন।

সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ ছাড়া সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা সহযোগী আফরিন মাহবুব, সানজানা খন্দকার ও সাদিয়া আফরিন এবং কর্মসূচি সহযোগী আয়েশা সুহাইমা রব উপস্থিত ছিলেন। 

এএইচ/এফএ