নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৩ পিএম
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে সফল ও টেকসই করতে জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
তাদের মতে, প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন না করে তাড়াহুড়ো করে উত্তরণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিই দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাতে রাজধানীর নীলক্ষেতে আইসিএমএবি ভবনের রুহুল কুদ্দুস অডিটোরিয়ামে দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের আসন্ন এলডিসি উত্তরণ: টেকসই রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা’ শীর্ষক কৌশলগত সংলাপে এসব মতামত উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সভাপতিত্ব করেন আইসিএমএবির প্রেসিডেন্ট মো. কাওসার আলম, এফসিএমএ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, রেডিয়েন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও আইসিএমএবির সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. আবদুর রহমান খান, এফসিএমএ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করলেও প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হবে উত্তরণ-পরবর্তী সময়কে সফলভাবে মোকাবিলা করা। এলডিসি সুবিধা শেষ হলে রফতানি, ওষুধ শিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করেই উত্তরণের পথে এগোনো উচিত।
তিনি জানান, সরকার জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং খাতের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করতে কাজ করছে। একইসঙ্গে কোম্পানি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা দ্রুত ও সম্পূর্ণ অনলাইনে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের শিল্প খাতের একটি বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
আইসিএমএবির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সুশাসন, অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের মানুষের সক্ষমতা ও সম্ভাবনা অনেক বেশি, প্রয়োজন কেবল কার্যকর বাস্তবায়ন।
বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এখন শুধু রফতানির পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, ভ্যালু অ্যাডিশন ও রপ্তানি আয়ের দেশে ধরে রাখার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি এবং স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে পোশাক শিল্পে অন্তত ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা, শুল্ক সুবিধা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের কৌশল তুলে ধরেন। তিনি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং নীতি সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াস মৃধাও বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইসিএমএবির সাবেক প্রেসিডেন্ট আরিফ খান, এফসিএমএ। শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইসিএমএবির সেক্রেটারি মনজুর মো. সাইফুল আজম, এফসিএমএ।
সংলাপে বক্তারা অভিন্নভাবে বলেন, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কাঠামোগত সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর।
এমআর/এএইচ