Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

সৃজনশীল খাতকে শখ নয়, শিল্প হিসেবে দেখতে হবে: পিপিআরসি

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ জুলাই ২০২৬, ০৫:১২ পিএম

সৃজনশীল অর্থনীতিকে দেশের নতুন প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু বাজেট বরাদ্দ নয়, কার্যকর করনীতি, কপিরাইট সুরক্ষা, লাইসেন্সিং সংস্কার এবং মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিভা থাকলেও নীতিগত সহায়তার অভাবে চলচ্চিত্র, ওটিটি, প্রকাশনা, সংগীত, হস্তশিল্প ও অন্যান্য সৃজনশীল শিল্পখাত কাঙ্ক্ষিত বিকাশ লাভ করতে পারেনি। সৃজনশীল খাতকে শখ নয়, বরং শিল্প হিসেবে দেখতে হবে। 

শনিবার (১১ জুলাই) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি: স্লোগান ওর আনট্যাপড পটেনশিয়াল’ শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনায় বক্তারা এসব বলেন।

সভায় জানানো হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ৮০০ কোটি টাকার কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা সরাসরি বরাদ্দ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, এই খাতের মাধ্যমে জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চলচ্চিত্র, সংগীত, প্রকাশনা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও ডিজাইন খাতে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন চলচ্চিত্র নির্মাতা তানিম নূর, চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রেদওয়ান রনি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, নাট্যকার ও তারুয়ার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর বাকার বকুল, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন এবং ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টসের (সিএইচপি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদ বিন আব্দুস সালাম।

চলচ্চিত্র নির্মাতা তানিম নূর বলেন, সৃজনশীল খাতের জন্য পৃথক করনীতি প্রণয়ন করা হলে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে চলচ্চিত্র শিল্পে কর অব্যাহতি দেওয়া হলে নতুন ও বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।

চরকির সিইও রেদওয়ান রনি বলেন, চলচ্চিত্র ও ওটিটি শিল্পকে এগিয়ে নিতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর ও লাইসেন্সিং নীতির সংস্কার জরুরি। তিনি অভিযোগ করেন, দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো করের আওতায় থাকলেও নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজনের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম একই ধরনের বাধ্যবাধকতার মুখোমুখি হয় না। এতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছে। 

 

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, দেশে সৃজনশীল প্রতিভার অভাব নেই। তবে সেই প্রতিভাকে বিকশিত ও বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর মতো শক্তিশালী ইকোসিস্টেম এখনও তৈরি হয়নি। এজন্য সরকারের কাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।

নাট্যকার বাকার বকুল বলেন, বাংলাদেশে নাটক ও শিল্পকলাকে এখনও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে দেখা হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ব্যক্তিগত আবেগের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, নাটককে স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে এটিকে পেশাদার শিল্পে রূপ দিতে হবে।

প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, প্রকাশনা খাত দেশের সবচেয়ে অবহেলিত খাতগুলোর একটি। জাতীয় গ্রন্থনীতি হালনাগাদ হয়নি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশি প্রকাশনা শিল্পকে তুলে ধরার উদ্যোগও সীমিত। পাশাপাশি কপিরাইট আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে ডিজিটাল ও মুদ্রণ পাইরেসি প্রকাশনা শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হস্তশিল্প উদ্যোক্তা মো. তৌহিদ বিন আব্দুস সালাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে মান সনদ, কমপ্লায়েন্স ও কার্যকর ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করা জরুরি। এগুলো ছাড়া রপ্তানি সম্প্রসারণ সম্ভব নয়।

সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য একটি সমন্বিত নীতি-পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, করনীতি পর্যালোচনা, রয়্যালটি বণ্টন, কপিরাইট সুরক্ষা এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সংস্কারকে নীতিগত অগ্রাধিকার দিতে হবে। একইসঙ্গে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদেরও যৌথভাবে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

এমএইচ/ক.ম