নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম
দেশের অর্থনীতিতে একদিকে যেমন রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রফতানির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
বুধবার (৮ জুলাই) পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত জুনের হালনাগাদ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এমনই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা এপ্রিলে ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ চাপ বেড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে পৌঁছেছে।
যদিও বোরো মৌসুমে ভালো উৎপাদনের কারণে চালের দামে কিছুটা স্বস্তি ছিল, তবে সবজি, মাছ, ফলমূল, দুধ, ডিম ও ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সবজির মূল্যবৃদ্ধিই খাদ্য মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
এদিকে পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিতেও। পরিবহন সেবা, ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যা বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
জিইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার অনেক কম। মে মাসে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ২১ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে ১ দশমিক ২১ শতাংশ পয়েন্ট কম। ফলে সাধারণ শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এতে নতুন বিনিয়োগে ব্যবসায়ীদের অনীহা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সতর্কতার ইঙ্গিত মিলছে। একই সময়ে সরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের ব্যবহারও কিছুটা কমেছে।
রাজস্ব আদায়ের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। মে মাসে এনবিআরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।
ফলে এক মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। আমদানি-রফতানি শুল্ক, ভ্যাট এবং আয়কর, তিনটি প্রধান উৎস থেকেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হারও আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। উন্নয়ন ব্যয় প্রায় ৯ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক সহায়তানির্ভর প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নেও ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে।
তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বৈদেশিক খাত অর্থনীতিকে স্বস্তি দিচ্ছে। মে মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। একইভাবে তৈরি পোশাক রপ্তানিও ধারাবাহিকভাবে বেড়ে মে মাসে ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
রেমিট্যান্স ও রফতানি প্রবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক খাত শক্তিশালী থাকলেও আমদানি ব্যয় পরিশোধের চাপে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সামান্য হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে রিয়েল ইফেকটিভ এক্সচেঞ্জ রেট বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতায় চাপ সৃষ্টি করছে।
জিইডি বলছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়। সরবরাহ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, রাজস্ব আদায়ের আওতা বৃদ্ধি এবং এডিপি বাস্তবায়নে গতি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করার সুপারিশও করেছে সংস্থাটি।
এএইচ/এএইচ