Dhaka Mail Logo

অর্থনীতি

রিকন্ডিশন্ড গাড়িতে কর বৃদ্ধির প্রস্তাবে মধ্যবিত্তের স্বপ্নে ধাক্কা

মহিউদ্দিন রাব্বানি

২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম

বাংলাদেশের রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বাজারে অনেকদিন ধরেই মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস ও করহার বৃদ্ধির উদ্যোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন করে কর বাগানোর প্রস্তাবে গাড়ির দাম আরও বাড়বে। এতে বাজার আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আমদানি ও বিক্রি কমে গেলে একদিকে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যদিকে সরকারের প্রত্যাশিত রাজস্বও কমে যেতে পারে।

প্রভাব পড়বে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের ওপরও। কারণ ব্যক্তিগত গাড়ির বাজারে রিকন্ডিশন্ড গাড়িই দীর্ঘদিন ধরে মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

জনপ্রিয় গাড়ির দাম বাড়তে পারে কয়েক লাখ টাকা

প্রস্তাবিত বাজেটে ১ থেকে ১৫০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ির বিদ্যমান কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান শ্রেণিবিন্যাসের পরিবর্তে ১-১২০০ সিসি এবং ১২০১-১৬০০ সিসি নামে নতুন দুটি স্ল্যাব নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ শ্রেণির গাড়ির ওপর মোট করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ রিকন্ডিশন ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক বলেন, এই কর বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়বে বাজারের সবচেয়ে জনপ্রিয় মডেলের গাড়িগুলোর ওপর।

তার মতে, একটি রিকন্ডিশন্ড টয়োটা প্রিমিওর দাম প্রায় তিন লাখ টাকা এবং টয়োটা এক্সিওর দাম আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

আবদুল হক বলেন, গাড়ির দাম বাড়লে ক্রেতার সংখ্যা কমে যাবে। ফলে বিক্রি কমবে, আমদানি কমবে। এতে ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সরকারও রাজস্ব হারাবে। বাস্তবতা হলো, করহার বাড়ালেই রাজস্ব বাড়ে না।

ভিন্ন দৃশ্য বন্দরের কারশেডে

চট্টগ্রাম বন্দরের চিত্রই বলে দিচ্ছে বাজার কতটা সংকুচিত হয়েছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে বন্দরের কারশেডগুলো রিকন্ডিশন্ড গাড়িতে পূর্ণ থাকত, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন দৃশ্য।

খাতসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে ২ হাজার ৮১৭টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৪১টিতে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় ৫৬ শতাংশ।

তথ্য মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন কারশেডে সাধারণত ৭০০ থেকে ৮০০ গাড়ি অবস্থান করলেও বর্তমানে সেখানে রয়েছে মাত্র ২১৮টি গাড়ি। বন্দরের তিনটি কারশেডের মোট ধারণক্ষমতা ১ হাজার ২৫০ ইউনিট হলেও তার অর্ধেকেরও কম জায়গা ব্যবহার হচ্ছে।

বন্দরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত এক দশকে এমন পরিস্থিতি খুব কমই দেখা গেছে।

বাজারের মন্দা কি অর্থনীতিরও সংকেত?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে অনেকেই গাড়ি আমদানি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটের মূল কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

বারভিডার সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, গাড়ির বাজারে মন্দা মানে অর্থনীতিতে আস্থার সংকট। মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ নেই, ব্যবসায় সম্প্রসারণ নেই, করপোরেট খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে। ফলে গাড়ি কেনার প্রবণতাও কমে গেছে।

হাবিবুর রহমান আরও বলেন, গাড়ি এমন একটি পণ্য, যা মানুষ তখনই কেনে যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাস থাকে। বর্তমানে সেই আস্থার জায়গাটিই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যক্তিগত গাড়ির বাজার একটি দেশের ভোক্তাদের আস্থা, বিনিয়োগ প্রবণতা এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যখন অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন বড় অঙ্কের ব্যয় সবচেয়ে আগে কমে যায়।

উল্টো রাজস্ব হারানোর শঙ্কা

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি খাত দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অন্যতম বড় রাজস্ব উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর এ খাত থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি কমে যাওয়ার কারণে রাজস্ব আয়েও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। গত বছরের প্রথম চার মাসে যেখানে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল, চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৪৫ কোটি টাকায়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে গাড়ির দাম আরও বাড়বে, বাজার আরও ছোট হবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যেতে পারে।

রিকন্ডিশন্ড খাতে চাপ

বারভিডার বড় আপত্তি শুল্ক কাঠামোর বৈষম্য নিয়ে। সংগঠনটির দাবি, নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্ক-সুবিধা দেওয়া হলেও রিকন্ডিশন্ড প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ওপর ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে নতুন গাড়ির তুলনায় রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম বেশি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তাদের মতে, এটি বাজারে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা রিকন্ডিশন্ড গাড়ি শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

বৈদ্যুতিক গাড়ির নীতিতে বাস্তবতার প্রতিফলন চান বিশেষজ্ঞরা

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩ হাজার সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতার অন্তত ৫ হাজার ২৮৮টি গাড়ি রয়েছে। অন্যদিকে, নতুন বাজেটে বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাকের জন্য বিদ্যমান শুল্ক সুবিধা পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন হলেও দেশের বিদ্যুৎ ও চার্জিং অবকাঠামোর বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যাবে না।

অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের’ চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় ইলেকট্রিক যানবাহন কতটুকু পরিবহন চাহিদা পূরণ করতে পারবে, সেটি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ সামগ্রিক চাহিদার বড় অংশ এখনো প্রচলিত জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের মাধ্যমেই পূরণ করতে হবে।

মাসরুর রিয়াজ বলেন, নন-ইলেকট্রিক যানবাহন যাতে অযৌক্তিক করের শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। দেশের জ্বালানি বাস্তবতা, চার্জিং অবকাঠামো এবং পরিবহন চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কী ধরনের যানবাহন মিশ্রণ প্রয়োজন, তার ভিত্তিতেই করনীতি নির্ধারণ করা উচিত।

তার মতে, চূড়ান্ত বাজেটে বিষয়টি প্রতিফলিত না হলেও পরবর্তী বাজেট সংশোধনের সময় এ বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দূরে সরে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন

বাংলাদেশে ব্যক্তিগত গাড়ির বাজারে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি শুধু একটি পণ্য নয়, বরং মধ্যবিত্তের জীবনমান উন্নয়নের একটি প্রতীক। বহু পরিবার বছরের পর বছর সঞ্চয় করে একটি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি কেনার পরিকল্পনা করে।

কিন্তু ডলারের উচ্চ মূল্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমদানি সংকোচন এবং সম্ভাব্য কর বৃদ্ধির কারণে সেই স্বপ্ন ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উৎসাহিত করা এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নীতি প্রণয়নের সময় বাজারের বাস্তবতা, ভোক্তার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গাড়ি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান জিএসির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ আরিফুল ইসলাম মনে করেন, নতুন কর কাঠামোয় মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের গাড়ি কেনা কঠিন হবে।

তিনি বলেন, ‘যারা মিড-রেঞ্জের গাড়ি অথবা তুলনামূলক কম দামে চীনা গাড়ি কিনতে চান এবং ভালো পারফরম্যান্স খোঁজেন, তাদের জন্য গাড়ি কেনা আরও কঠিন হয়ে যাবে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব গাড়ি তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।’

তার মতে, এর ফলে শুধু ক্রেতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, ব্যবসার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি বাজার আরও ধীরগতির হবে। বর্তমানে যে মন্দা চলছে, নতুন কর কার্যকর হলে সেটি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।’

এমআর