আব্দুল হাকিম
১৬ জুন ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম
দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল কাঠামো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)। এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবছর অবকাঠামো থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু সর্বশেষ এডিপির চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। তালিকায় যেমন বাড়ছে প্রকল্পের সংখ্যা, তেমনি বাড়ছে ‘কাগুজে প্রকল্পের’ উপস্থিতিও।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে ১ হাজার ৬৩টি প্রকল্প কোনো অর্থ বরাদ্দ ছাড়াই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি অর্থায়নের আশায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আরও ১৭৯টি অননুমোদিত প্রকল্প। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এসব প্রকল্প কি বাস্তবায়নের জন্য রাখা হয়েছে, নাকি কেবল কাগজে-কলমে উন্নয়নের চিত্র দেখানোর জন্য?
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বরাদ্দই হচ্ছে প্রথম শর্ত। সেখানে এক হাজারের বেশি প্রকল্পকে বরাদ্দহীন রেখে তালিকাভুক্ত করার অর্থ হলো ভবিষ্যতে অর্থ পাওয়া গেলে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এসব প্রকল্পের বড় একটি অংশ বছরের পর বছর তালিকায় থেকে যায়, অথচ বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। এতে উন্নয়ন পরিকল্পনার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে মোট প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ১০৮। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৩টি প্রকল্প কোনো বরাদ্দ ছাড়াই পৃথক তালিকায় রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মোট প্রকল্প সংখ্যার প্রায় সমপরিমাণ প্রকল্পই অর্থহীন অবস্থায় পরিকল্পনার অংশ হয়ে আছে। পাশাপাশি ১৭৯টি অননুমোদিত প্রকল্প বিদেশি অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস খোঁজার উদ্দেশ্যে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু পরিকল্পনা প্রণয়নের দুর্বলতা নয়, বরং উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। কারণ কোনো প্রকল্প অনুমোদন পায়নি, অর্থ বরাদ্দ নেই, অর্থায়নের উৎসও নিশ্চিত নয়, তারপরও সেটি এডিপিতে স্থান পাচ্ছে। এতে প্রকল্প তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ছে না।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এডিপিতে প্রতীকী বা নামমাত্র বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্প ধরে রাখার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এক লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্প তালিকাভুক্ত রাখার চর্চা চলে আসছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এমন প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭টিতে, যা মোট প্রকল্পের ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৪৫টি, যা মোট প্রকল্পের ৪ দশমিক ১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এক লাখ টাকা দিয়ে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এই বরাদ্দের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো প্রকল্পটিকে সরকারি তালিকায় জীবিত রাখা। ভবিষ্যতে সুযোগ হলে কিংবা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অগ্রাধিকার পেলে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে। কিন্তু এভাবে বছরের পর বছর প্রকল্প ঝুলে থাকলে পরিকল্পনার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উন্নয়ন পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক সময় নতুন প্রকল্পের ধারণা তৈরি হলেও তাৎক্ষণিক অর্থের সংস্থান করা সম্ভব হয় না। ফলে সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোকে তালিকায় রাখা হয়। তবে সমালোচকদের মতে, বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও অর্থায়নের নিশ্চয়তা ছাড়া প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির প্রবণতা শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে।
বিশ্লেষণে আরো দেখা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ এবং ব্যয় বৃদ্ধি এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে থাকা ৯৭৬টি বিনিয়োগ প্রকল্পের গড় বয়স ৫ দশমিক ৭ বছর। এর মধ্যে ৩২২টি প্রকল্পের বয়স ৬ থেকে ১০ বছর। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৪৭টি প্রকল্পের বয়স ১০ বছরেরও বেশি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি উন্নয়ন প্রকল্প যখন বারবার সময় বাড়ানোর মাধ্যমে চলতে থাকে, তখন এর ব্যয়ও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে একই অর্থ দিয়ে যতগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল, তার চেয়ে কম প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। এতে জনসাধারণ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয় এবং সরকারি অর্থের কার্যকারিতাও কমে যায়।
এদিকে চলতি অর্থবছরের এডিপি বিশ্লেষণ করে এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর প্রায় ৪৮ শতাংশ অন্তত এক থেকে চারবার সংশোধন করা হয়েছে। সময় বৃদ্ধি পাওয়া প্রকল্পের সংখ্যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪৬৩ থেকে বেড়ে ৪৬৮-এ পৌঁছেছে। দ্বিতীয়বার সময় বৃদ্ধি পাওয়া প্রকল্পের সংখ্যাও এক বছরে ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
সংস্থাটি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪০৩টি প্রকল্প নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শেষ হওয়ার কথা। একই সঙ্গে ৩৭৭টি ‘ক্যারিওভার’ প্রকল্পও রয়েছে, যেগুলোর কাজ আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ মোট ৭৮০টি প্রকল্প এ বছর শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন নিজেই মাত্র ২৩১টি প্রকল্পকে সম্ভাব্য সমাপ্তিযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে না। ফলে আবারো সময় বৃদ্ধি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন করে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হবে।
সিপিডি বলছে, উন্নয়ন পরিকল্পনার সাফল্য শুধু নতুন প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং কত দ্রুত, কত দক্ষতার সঙ্গে এবং কত কম ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য বিষয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে ১ হাজার ৬৩টি বরাদ্দহীন প্রকল্প, ১৭৯টি অননুমোদিত প্রকল্প এবং ৭৭টি প্রতীকী বরাদ্দ পাওয়া প্রকল্পের উপস্থিতি তাই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। উন্নয়নের এই দীর্ঘ তালিকা কতটা বাস্তব এবং কতটা কাগুজে, সেই উত্তর খুঁজতে এখন সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার দিকেই তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের সময় ব্যয়, সময় ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। ফলে পরে গিয়ে সংশোধন, সময় বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হচ্ছে। এই চিত্র উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার একটি গভীর সংকটের প্রতিফলন। একদিকে নতুন প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো প্রকল্প শেষ হচ্ছে না। ফলে প্রকল্পের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবায়নের সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
উন্নয়ন গবেষকরা বলছেন, এডিপির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাস্তবায়নযোগ্য ও অর্থায়ন নিশ্চিত প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু যখন বিপুলসংখ্যক বরাদ্দহীন ও অননুমোদিত প্রকল্প তালিকাভুক্ত করা হয়, তখন প্রকৃত অগ্রাধিকার নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। এতে রাজনৈতিক বিবেচনা, প্রশাসনিক চাপ এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাবও কাজ করার সুযোগ পায়। প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয়তা যাচাই, অর্থায়নের উৎস নিশ্চিতকরণ, বাস্তবায়ন সক্ষমতার মূল্যায়ন এবং সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও কঠোর হতে হবে। একই সঙ্গে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজন হলে বাতিল করার সাহসও দেখাতে হবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, অনেক সময় এডিপিতে এমন কিছু প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেগুলোর জন্য তখনো অর্থ বরাদ্দ বা অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। এর একটি বড় কারণ হলো প্রকল্প প্রণয়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া। চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার তুলনামূলক কম সময় পেয়েছে। ফলে অনেক প্রয়োজনীয় প্রকল্পের ধারণা থাকলেও সেগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি, অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ কিংবা সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, এসব প্রকল্পকে বাদ না দিয়ে এডিপির তালিকায় রাখা হয়েছে, যাতে পরবর্তীতে অর্থায়ন পাওয়া গেলে সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া যায়। বিশেষ করে অনেক প্রকল্পই বৈদেশিক সহায়তানির্ভর। অর্থায়ন নিশ্চিত হলে তখন ডিপিপি চূড়ান্ত করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। তাই বরাদ্দ না থাকলেও প্রকল্পগুলোকে প্রয়োজনীয় বিবেচনায় তালিকাভুক্ত রাখা হয়েছে।
বরাদ্দহীন প্রকল্পের সংখ্যা এ বছর তুলনামূলক বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সময়ের স্বল্পতার কারণে অনেক প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ প্রণয়ন সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় অঙ্কের ‘থোক বরাদ্দ’ রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে এসব থোক বরাদ্দের বিপরীতে বিভিন্ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হতে পারে। প্রকল্প প্রণয়ন একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজনীয় সমীক্ষা, সম্ভাব্যতা যাচাই ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। কিন্তু এবার সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার একদিকে বিভিন্ন খাতে থোক বরাদ্দ রেখেছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোকে এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভবিষ্যতে এসব প্রকল্পের কিছু থোক বরাদ্দ থেকে এবং কিছু অতিরিক্ত অর্থায়ন পাওয়া গেলে বাস্তবায়ন করা হবে।
এএইচ/এমআর