নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম
দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির পরিচালনা ঠিক রাখতে পর্যবেক্ষকও নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত উত্তোলন এবং তারল্য সংকটে পড়ার কারণে ইসলামী ব্যাংককে বড় অংকের ঋণও দেওয়া হয়েছে। সবশেষ সংকট মোকাবেলায় ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে বসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মাধ্যমে শিগগির তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠার আশা করা হচ্ছে।
কোরবানির ঈদের পর ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটিতে অস্থিরতা শুরু হয়। তার নিয়োগের বিরোধিতা করে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে আন্দোলনকারীরা ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক ব্যাংকটি থেকে আমানত তুলে নিতে শুরু করলে তারল্য সংকট দেখা দেয়। ফলে অনেক গ্রাহকের অর্থ উত্তোলনের চাহিদা পূরণে হিমশিম খেতে হয় ব্যাংকটিকে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) হারও বজায় রাখতে পারেনি।

গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত প্রত্যাহারের কারণে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকটি বড় ধরনের তারল্য চাপে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা দেয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ সহায়তার মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা নগদ অর্থ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে আন্তঃব্যাংক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সেবা সচল রাখতে। এর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং গ্রাহকদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে তৈরি হওয়া আস্থার সংকট, গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত উত্তোলন এবং তারল্য সংকটে পড়া ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।
রোববার (১৪ জুন) বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে শুরু হওয়া এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এছাড়া বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব), দুজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এবং ছয়জন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অংশ নিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা চলমান তারল্য পরিস্থিতি, গ্রাহকদের আমানত উত্তোলনের প্রভাব এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে গভর্নরকে বিস্তারিত অবহিত করেন। একইসঙ্গে সংকট কাটিয়ে উঠতে সম্ভাব্য করণীয় নিয়েও আলোচনা হয়।
ব্যাংকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আশ্বাস:
গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আলতাফ হোসাইন বলেছেন, ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং গ্রাহকরা আগামী দিনে আরও ভালো সেবা পাবেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে তাদের আলোচনা মূলত ব্যাংকের দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রম, নগদ অর্থের প্রবাহ, লেনদেন পরিস্থিতি এবং আগামী দিনের অর্থের চাহিদা নিয়ে হয়েছে। ব্যবসার বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়নি।
আলতাফ হোসাইন বলেন, আজ আমরা কোন খাতে অর্থ পেয়েছি, কোথায় ব্যয় করেছি, কী পরিমাণ অর্থ উত্তোলন হয়েছে এবং আগামী দিনে কত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, এসব বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
দুই দিনে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা তোলা হয়েছে:
নগদ অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে এমডি জানান, গত দুই দিনে ব্যাংক থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো উত্তোলন হয়েছে। একই সময়ে আমানত জমার পরিমাণও প্রায় কাছাকাছি রয়েছে। তবে আরটিজিএস ও আন্তঃব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে কিছু অর্থ বেরিয়ে যাওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।
অনলাইন লেনদেন নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগের বিষয়ে আলতাফ হোসাইন বলেন, ব্যাংকের নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অভ্যন্তরীণ লেনদেনে কোনো সমস্যা নেই। সেলফিন এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তহবিল স্থানান্তর স্বাভাবিকভাবে চলছে। তবে আন্তঃব্যাংক স্থানান্তরের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা দ্রুত সমাধানের জন্য কাজ করা হচ্ছে।
রেমিট্যান্স সেবা অগ্রাধিকার:
রেমিট্যান্স সেবা সম্পর্কে আলতাফ হোসাইন বলেন, রেমিট্যান্স পরিশোধ আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। গ্রাহকদের বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ যথাসময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করতে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।
গ্রাহকদের উদ্দেশে এমডি বলেন, আজ যারা সেবা পেয়েছেন, আগামীকাল তারা আরও ভালো সেবা পাবেন। আমাদের সেবার মান প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে। আমরা আশা করছি, বিদ্যমান পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
চেক ক্লিয়ারিং কার্যক্রম প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আলতাফ হোসাইন জানান, চেক নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং এ কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। বৈঠক চলাকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি, গ্রাহকসেবা এবং লেনদেন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়ে বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি গ্রাহকদের ব্যাপক অর্থ উত্তোলনের কারণে ইসলামী ব্যাংক তারল্য চাপে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এরই মধ্যে ব্যাংকটিকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ক.ম/