নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ জুন ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ভোক্তাবান্ধব আখ্যা দিয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটি জানিয়েছে, বাজেটের সুফল নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের উপর।
শনিবার (১৩ জুন) প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড়, সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রণোদনার মতো উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা। তবে এসব সুবিধার প্রকৃত সুফল ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাবে কি না, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে বাজেটের কার্যকর বাস্তবায়ন, তদারকি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর।
নাজের হোসাইন বলেন, দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি সরকারের উপস্থাপিত এ বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যে কর অব্যাহতি, তামাকজাত পণ্যে কর বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম আমদানিতে কর হ্রাস এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মতো উদ্যোগ সাধারণ ভোক্তাদের জন্য ইতিবাচক। তবে কর ছাড়ের সুবিধা প্রকৃতপক্ষে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সরকারকে কঠোর নজরদারি করতে হবে। নাগরিক পর্যবেক্ষণ, কার্যকর তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দক্ষতা ও সদিচ্ছা ছাড়া এসব উদ্যোগের সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে না।
তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে তদারকির অভাবে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে সরকার বিভিন্ন সুবিধা দিলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পায়নি। ব্যবসায়ীরা সরকারের নীতির বাইরে গিয়ে কোনো কৌশলে বাজারকে প্রভাবিত করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। অন্যথায় কৃষক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা পর্যন্ত সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
কনটেন্ট নির্মাতা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কর কাঠামো সহজ করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে নাজের বলেন, অধিকাংশ মানুষ কর দিতে আগ্রহী হলেও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই কর ব্যবস্থার বাইরে থাকেন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ও প্যাকেজভিত্তিক কর ব্যবস্থা চালু করা গেলে রাজস্ব আহরণ যেমন বাড়বে, তেমনি কর প্রদানও সহজ হবে।
প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ট্রেন ও মেট্রোরেলে কর ছাড়ের প্রস্তাবকে ইতিবাচক উল্লেখ করলেও তিনি বলেন, বর্তমানে টিকিট ছাড়ার পরপরই অধিকাংশ টিকিট শেষ হয়ে যায়। ফলে যেসব প্রবীণ নাগরিক এ সুবিধা পাওয়ার কথা, তারা বাস্তবে কতটা উপকৃত হবেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এজন্য প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর সুবিধার প্রশংসা করে ক্যাবের এই নেতা বলেন, গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কম দামে মানসম্মত সৌর সরঞ্জাম পাওয়া গেলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে এবং বিদ্যুতের ওপর চাপও কমবে।
তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রশংসনীয় হলেও বরাদ্দের পরিমাণের চেয়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট কত বড় হলো, তার চেয়ে বরাদ্দ কতটা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হলো, সেটিই মূল বিবেচ্য বিষয়।
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ে বিদ্যমান নানা অভিযোগ দূর করে কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ না হলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
বাজেট বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, প্রশাসনে দলীয়করণ বা পক্ষপাতিত্ব থাকলে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তবে বাজেটের কিছু বিষয়ে হতাশার কথাও তুলে ধরেন তিনি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণে বাড়তি বরাদ্দ না থাকা, আয়করমুক্ত সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত না করা এবং ভোক্তা শিক্ষা ও সচেতনতায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়গুলোকে তিনি সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
একই সঙ্গে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি, শহুরে দরিদ্রদের আবাসন সুবিধা এবং রেল ও গণপরিবহন খাতে আরও বেশি বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, সরকারের ঘোষিত জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং সাধারণ ভোক্তারা উপকৃত হবেন, পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।
এমআর/এএইচ