নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ জুন ২০২৬, ১১:২৩ পিএম
করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং করের আওতা সম্প্রসারণ করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে সরকার। দেশের বিপুলসংখ্যক আয়ক্ষম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখনও কর ব্যবস্থার বাইরে থাকায় তাদের কর নেটের আওতায় এনে রাজস্ব ভিত্তি শক্তিশালী করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত আয়করে স্বস্তি, ডিজিটাল কর প্রশাসন এবং করদাতাবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি আধুনিক ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ ঘোষণা দেন।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও কর আহরণের পরিধি সেই হারে বাড়েনি। ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রীয় সেবার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের কর আহরণের হার এখনও অনেক কম। এই বাস্তবতায় করের হার বৃদ্ধি না করে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আয়ক্ষম ব্যক্তি, পেশাজীবী এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হবে। কর নিবন্ধন সহজ করা, কর পরিশোধ প্রক্রিয়া হয়রানিমুক্ত করা এবং করদাতাদের জন্য আধুনিক সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্বেচ্ছায় কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায় সরকার।
বাজেটের সপ্তম অধ্যায়ে ব্যক্তিগত আয়কর কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু আগামী অর্থবছরের জন্য নয়, আগামী পাঁচ বছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমার একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপও ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা থাকবে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত হবে। এরপর ২০৩০-৩১ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা দাঁড়াবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, করদাতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর কর কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর হলে ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনা সহজে করতে পারবেন। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও বাড়বে।
ব্যক্তিগত আয়করের হারও আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। করমুক্ত সীমার পরবর্তী ধাপগুলোতে ধাপে ধাপে কর আরোপ করা হবে। এর ফলে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কাছ থেকে অধিক রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে, অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে না।
রাজস্ব আহরণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনলাইনভিত্তিক কর নিবন্ধন, ই-রিটার্ন দাখিল, ডিজিটাল কর পরিশোধ এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার আওতা আরও সম্প্রসারণ করা হবে। করদাতারা যাতে ঘরে বসেই অধিকাংশ সেবা গ্রহণ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
সরকারের মতে, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে কর ফাঁকি কমবে, রাজস্ব অপচয় হ্রাস পাবে এবং কর আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ফাঁকি ও কর পরিহারের সুযোগও সীমিত করা সম্ভব হবে।
বাজেটে ব্যবসাবান্ধব কর সংস্কারের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে কর ব্যবস্থার জটিলতা কমানো হবে। ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করার পাশাপাশি কর প্রশাসনের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক আরও সহজ ও কার্যকর করা হবে।
রাজস্ব অধ্যায়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস, ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ কিংবা ১ শতাংশ হারে যে উৎসে কর আদায় করা হয়, তা কমিয়ে ০.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এই পদক্ষেপের ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় কমবে এবং বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করবে। এতে সাধারণ ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে সরকার আশা করছে।
তিনি আরও বলেন, একটি শক্তিশালী ও আত্মনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের বিকল্প নেই। বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব রাজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেই লক্ষ্যেই করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে চায় সরকার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের রাজস্ব অধ্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো করের হার বৃদ্ধি নয়, বরং কর নেট সম্প্রসারণ। ব্যক্তিগত আয়করে স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি নতুন করদাতা খুঁজে বের করা, কর ফাঁকি কমানো এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে সরকার রাজস্ব আহরণের নতুন পথ খুঁজছে। এই কৌশল সফল হলে আগামী বছরগুলোতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাতও আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংসদ ভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।
জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি থাকতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে সাড়ে ৭ শতাংশ।
এএইচ/এআর