images

অর্থনীতি

উচ্চাশার বাজেট, বাস্তবতার পরীক্ষা

মহিউদ্দিন রাব্বানি

১১ জুন ২০২৬, ০৯:৩৩ পিএম

  • বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা
  • নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কমানো হয়েছে কর ও শুল্ক
  • কম্পিউটার ও আইটি পণ্যে বড় ধরনের শুল্ক ছাড়
  • মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ
  • বাজেট বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ, বলছেন অর্থনীতিবিদরা

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য কর-শুল্কে কিছুটা স্বস্তি, ব্যবসা ও বিনিয়োগে নতুন প্রণোদনা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় এতে তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন দেখা গেলেও এর সফল বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের মতে, ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘাটতি, উচ্চ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য, ঋণনির্ভর অর্থায়ন এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠাই হবে এ বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশ নতুন এক গণতান্ত্রিক যাত্রায় প্রবেশ করেছে। সেই বাস্তবতায় এবারের বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের একটি রূপরেখা।

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে।

স্বস্তির বার্তা সাধারণ মানুষের জন্য

নতুন বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানো। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি ও বীজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গসহ বিভিন্ন মসলার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিশুখাদ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করায় প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে বলে সরকারের দাবি।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে উৎসাহিত করতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, মনিটর ও প্রিন্টার আমদানিতে প্রায় সব ধরনের শুল্ক ও কর তুলে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর কর কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার প্রসারে বড় ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।

Budget3
তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেট। ছবি: সংগৃহীত

এসব উদ্যোগের ফলে বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হলেও সেই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কিছু খাতে বাড়বে ব্যয়

স্বস্তির পাশাপাশি কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। সিগারেটের সব স্তরে ন্যূনতম মূল্য বৃদ্ধি করায় এর দাম বাড়বে। নিকোটিন পাউচ ও নিকোটিন গ্র্যানুলসের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনচালিত মধ্যম সারির গাড়ির করভার বাড়ানো হয়েছে। ফলে এসব গাড়ির দাম বাড়তে পারে। বিদেশি কাজুবাদাম, মধু, সুপারি, পাঙাশ মাছের ফিলে, কম্পোজিট গ্যাস সিলিন্ডার এবং বিভিন্ন আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের ওপরও বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। রড, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও কিছু ইলেকট্রনিক পণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি

বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়গুলোর একটি হলো এর ঘাটতি। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ হবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

এই ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকেই নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, অতীত সরকারের সময় ব্যাপক ঋণ গ্রহণের ফলে বর্তমানে সুদ ও ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। তাই ঋণ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, উচ্চ রিটার্নসমৃদ্ধ প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো আধুনিকায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে এই ঘাটতি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।

ব্যবসায়ীদের ইতিবাচক মূল্যায়ন

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) বাজেটকে সামগ্রিকভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর হ্রাস, পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে কর সুবিধা এবং অনলাইন ভ্যাট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে তিনি করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখার সমালোচনা করে বলেন, মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় এটি অন্তত ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন ছিল।

ডিসিসিআইর মতে, ঘোষিত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতি নতুন গতি পাবে। তবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাজেটের নীতিগত দিককে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, মানবিক অর্থনীতি, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং যুব উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক কাঠামো এখনো দুর্বল। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বাস্তবায়ন সক্ষমতার তুলনায় বড় বাজেট ঘোষণার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। ফলে ঘোষিত বাজেটের পুরোটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, করের বোঝা না বাড়িয়ে কিছু ক্ষেত্রে কমানোর উদ্যোগ ইতিবাচক। এতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও সমন্বিত ও কৌশলগত পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।

BNP
বাজেট বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে সব মহলই। ছবি: সংগৃহীত

তার মতে, মূল্যস্ফীতি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে। তাই রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় জরুরি।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও মিশ্র

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও ভিন্নমত দেখা গেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, বাজেটটি অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর এবং এতে দরিদ্র মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। তার অভিযোগ, এই বাজেটে ধনীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবে, অথচ মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের করের চাপ কমেনি।

অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব না হলে প্রকৃত ঘাটতি সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হবে।

বাস্তবায়নের পথে সাত বড় বাধা

বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট বাস্তবায়নের সামনে অন্তত সাতটি বড় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণ ও সুদের বাড়তি চাপ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তা এবং নীতি বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এ হার আরও কমে ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

তবে বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাস বলছে, বড় বাজেট ঘোষণা করাই সাফল্যের মাপকাঠি নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো সেই অর্থ দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করা, রাজস্ব সংগ্রহ নিশ্চিত করা এবং পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া।

সেই অর্থে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে একদিকে স্বস্তির প্রতিশ্রুতির বাজেট বলা যায়, অন্যদিকে এটি নতুন সরকারের সক্ষমতা যাচাইয়েরও একটি বড় পরীক্ষা। আগামী এক বছরে বাজেটের ঘোষণাগুলো কতটা বাস্তবে রূপ পায়, সেটিই নির্ধারণ করবে এই বাজেট জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে কি না।

এমআর/জেবি