images

অর্থনীতি

অর্থনীতির দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরলেন অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ জুন ২০২৬, ০৪:০৬ পিএম

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের অবনতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট, ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব তুলে ধরে অর্থনীতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও ভুল নীতির কারণে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর বক্তৃতাকালে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীরও এটি প্রথম বাজেট।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকারের সময় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

তিনি জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। কিন্তু তা বেড়ে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্পদের অসম বণ্টন, সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বেড়েছে। ২০০৫ সালে আয়ভিত্তিক জিনি সহগ ছিল ০ দশমিক ৪৬৭, যা ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বেড়ে ০ দশমিক ৪৯৯ হয়েছে।

রাজস্ব আহরণের দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। অন্যদিকে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ২০০৫ সালে ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে তা ঋণাত্মক হয়ে মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

পুঁজিবাজারের প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং ভুল নীতির কারণে পুঁজিবাজার কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দেশের ঋণের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা প্রায় সাড়ে ছয় গুণ বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৬ গুণের বেশি বেড়ে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৩ গুণের বেশি বেড়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের ঋণঝুঁকির অবস্থান ‘নিম্ন’ ঝুঁকি থেকে ‘মধ্যম’ ঝুঁকির পর্যায়ে নেমে এসেছে।

বৈদেশিক বাণিজ্যের চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ২১ দশমিক ৬ এবং ১২ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উভয় সূচকের প্রবৃদ্ধিই ঋণাত্মক হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ৬৮ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছেছে, যা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

বাজেট বক্তৃতায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার গঠনের মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ও ভর্তুকির চাপ আরও বেড়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের সবচেয়ে বড় কর্মক্ষেত্র হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা প্রবাসী আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, বাণিজ্য শুল্কের অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এসব বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা করেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংসদ ভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।

জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি থাকতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে সাড়ে ৭ শতাংশ।

এএইচ/জেবি