images

অর্থনীতি

সুশাসনের অভাবেই ব্যাংকিং খাত ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে: ডেপুটি গভর্নর

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

০৭ জুন ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম

দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান দুর্বল ও ভঙ্গুর অবস্থার জন্য সুশাসনের ঘাটতিকেই দায়ী করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার। তিনি বলেন, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায্যতা— সুশাসনের এই চারটি ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় ব্যাংক খাতে নানা সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি জনসমক্ষে তুলে ধরতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

রোববার (৭ জুন) রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংকখাতে সুশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

নুরুন নাহার বলেন, সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা, দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা। এই চারটি স্তম্ভ শক্তিশালী হলে ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব। কিন্তু নির্ধারিত নীতিমালা ও করপোরেট গভর্ন্যান্স যথাযথভাবে অনুসরণ না হওয়ায় ব্যাংক খাতে নানা ধরনের সমস্যা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক আগে থেকেই করপোরেট গভর্ন্যান্স সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছে। সেখানে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ডেপুটি গভর্নর বলেন, ব্যাংকের অধিকাংশ অর্থই আমানতকারীদের। তারা আস্থার ভিত্তিতে ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন। কিন্তু অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ কিংবা ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা ব্যাংকের তারল্য সংকট তৈরি করে। এর ফলে আমানতকারীরা নিজেদের অর্থ তুলতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হন।

ঋণ বিতরণে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কিছু গ্রাহকের ঋণ নেওয়ার সময় থেকেই তা পরিশোধের সদিচ্ছা থাকে না। তাই ঋণগ্রহীতা নির্বাচন এবং ঋণের অর্থ সঠিক খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি উন্মোচনে গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে নুরুন নাহার বলেন, অতীতে ঘটে যাওয়া বহু ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের ঘটনা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পেরেছে।

তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যম না থাকলে অনেক অনিয়মই আড়ালে থেকে যেত। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কারণে বিভিন্ন অনিয়ম প্রকাশ পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তেও পরিবর্তন এসেছে।

গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণ ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ পায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোন ব্যাংকের সেবা কেমন, কোথায় অর্থ রাখা নিরাপদ— এসব বিষয়ে মানুষ তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডেপুটি গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কাছে নতি স্বীকার না করে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিদ্যমান নীতিমালা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অর্থপাচারবিরোধী নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে ব্যাংক খাতের পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাত ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. মো. এজাজুল ইসলাম, ড. মো. মাশহিদুল ইসলাম জাহিদ এবং মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইআরএফ সদস্য ওবায়দুল্লাহ রনি এবং সানাউল্লাহ সাকিব (তনু)।

টিএই/এফএ