নিজস্ব প্রতিবেদক
০৫ জুন ২০২৬, ০৫:০৮ পিএম
চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপকূলে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ হিসেবে ভাঙার জন্য আনা হয়েছিল প্রায় ৬০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মূল্যের ২৯ বছরের পুরনো বিশাল কেমিক্যাল ট্যাংকার মেমেই। জাহাজটি পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনের অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে নোঙর করা জাহাজটি এখন আর ভাঙার জন্য শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে নেওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে জাহাজটি মূল মালিকের কাছে ফেরত পাঠানোর পদক্ষেপ নিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এস এন করপোরেশন।
এ পরিস্থিতিতে চরম বিপাকে পড়েছেন এস এন করপোরেশনের মালিক চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী ওরফে ডিসকো শওকত। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী নেটওয়ার্কের সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মেমেই এবং আরেক জাহাজ ‘ফ্লোরা’ দীর্ঘদিন ধরে ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত। জাহাজ দুটির মালিক হংকং-ভিত্তিক এভার শাইনিং লিমিটেড। এটা জানার পরও এস এন করপোরেশন তাদের সঙ্গে জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে কেনার চুক্তি করে। ফলে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এস এন করপোরেশন ও ডিসকো শওকতের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে জানতে এস এন করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী বারাকাত উল্লাহকে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া দেননি তিনি। পরে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এখানে এস এন করপোরেশনের দোষ নেই। জাহাজটি বাংলাদেশ জলসীমায় পৌঁছার পরই এমন নিষেধাজ্ঞার খবর জানা গেছে। জানার পর জাহাজটি দেশে আনা হলে হয়তো আইনি জটিলতা তৈরি হতো।
আনাম চৌধুরীর ভাষ্য, জাহাজটি যেহেতু বাংলাদেশে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য আনা হয়নি, জাহাজ ভেঙে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির কথা ছিল, তাই জাহাজ ভেঙে ফেলাটাই ভালো সিদ্ধান্ত হতো। সেই ঝুঁকি হয়তো নেবে না বাংলাদেশ। জাহাজটি মূল মালিকের কাছে ফেরত যাবে।
আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংক্রান্ত তথ্য ও জাহাজ ট্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ৪৪ হাজার ৮০০ টন ধারণক্ষমতার রাসায়নিক ও তেলবাহী ট্যাংকার মেমেই’ (আইএমও: ৯১৩৩০৮২) গত ২২ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। জাহাজটি স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি হয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপকূলে এস এন করপোরেশনে ভাঙার উদ্দেশে আনা হয়েছিল।
জাহাজটির লাইট ডিসপ্লেসমেন্ট টনেজ (এলডিটি) ৯ হাজার ৮৭৭ দশমিক ১ টন। দৈর্ঘ্য ১৮০ মিটার এবং প্রস্থ ৩২ দশমিক ২ মিটার। ১৯৯৭ সালে নির্মিত পালাউ-পতাকাবাহী এই জাহাজটি মূলত সমুদ্রপথে তেল ও রাসায়নিক পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো। অতীতে জাহাজটি মুল্যান্ড, ইকো এবং হার্লে নামেও পরিচালিত হয়েছে বলেও নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহিঃনোঙরে পৌঁছানোর মাত্র ছয় দিন পর গত ২৮ মে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এবং অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) জাহাজটিকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের মার্কিন নীতির অংশ হিসেবে নির্বাহী আদেশ ১৩৮৪৬-এর আওতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, মেমেই’ জাহাজটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনে জড়িত ছিল। শুধু এই জাহাজই নয়, এর নিবন্ধিত মালিক হংকংভিত্তিক এভার শাইনিং লিমিটেডকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, এভার শাইনিং লিমিটেডের মালিকানাধীন আরেকটি জাহাজ ফ্লোরা ২০২৩ সাল থেকে অন্তত ১৪ বার ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বোঝাই করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জেনেশুনে ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ক্রয়, বিক্রয়, পরিবহন বা বিপণনের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখযোগ্য লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এ কারণে মেমেই এবং ফ্লোরাকে এভার শাইনিং লিমিটেডের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

জাহাজ রিসাইক্লিং বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মেমেই জাহাজটির আনুমানিক স্ক্র্যাপ মূল্য প্রায় ৪৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার সমান। নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ঠিক আগে জাহাজটি ভাঙার জন্য বিক্রি করা হয়েছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ফলে এখন জাহাজটি ইয়ার্ডে নিয়ে গিয়ে ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট আইনি ও বাণিজ্যিক জটিলতায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান জাহাজটি ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার ফলে জাহাজ এবং এর মালিকের যেকোনো মার্কিন সম্পদ বা স্বার্থ জব্দ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এর সঙ্গে লেনদেনে যুক্ত বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওপরও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপের আশঙ্কা রয়েছে। একইসাথে চট্টগ্রামভিত্তিক এস এন করপোরেশনকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চট্টগ্রামভিত্তিক এস এন করপোরেশনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবার আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। কারণ এভার শাইনিং লিমিটেড এবং তাদের জাহাজ মেমেই ও ফ্লোরা ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবহন কার্যক্রমে জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশ্যে থাকার পরও এস এন কর্পোরেশন তাদের কাছ থেকে জাহাজটি স্ক্র্যাপ হিসেবে কেনার চুক্তি করে।
জাহাজটি কেনার পর নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশে আনার আগে গত ১৭ মে শিল্প মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে এসএন করপোরেশন। অনুমোদনের পর ১৮ মে বিদেশি ক্রেতা প্রতিনিধির সঙ্গে এগ্রিমেন্ট হয় প্রতিষ্ঠানটির। ব্যাংক থেকে ঋণপত্র খোলা হয় ২১ মে। এরপর ২৬ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে জাহাজটি। ঈদুল আজহার ছুটি শেষে জাহাজটি ভাঙার জন্য নিজেদের ইয়ার্ডে ভিড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এস এন করপোরেশন। এরইমধ্যে জানা গেল মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে জাহাজটি।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে এস এন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানার পর তারা জাহাজটির ডেলিভারি গ্রহণ করেননি। আমদানি ঋণপত্রের বিপরীতে কোনো অর্থ পরিশোধ না করায় ক্রয়চুক্তি এবং এলসি বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। জাহাজটির মালিকানা ও দায়দায়িত্ব এখন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছেই রয়েছে।
আইকে/জেবি