নিজস্ব প্রতিবেদক
০৩ জুন ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম
জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর)। ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ ঘিরে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য কৌশলের ধারাবাহিক অংশ, যা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে চাপ তৈরি করতে পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে দেশটিতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১৯ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে। এই চুক্তি নিয়ে দেশেও ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে।
এর মধ্যেই মার্কিন বাণিজ্য নীতিতে নতুন মোড় আসে, যখন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফকে সংবিধানবিরোধী এবং আইনগতভাবে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর শুল্ক কাঠামোতে বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে ট্রাম্প প্রশাসন।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের অভিযোগে তদন্ত শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে বলা হয়, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে।

সেই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেয়। ইউএসটিআরের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ জেমসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে তৈরি পণ্য আমদানি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের ব্যর্থতা অগ্রহণযোগ্য। এতে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা বৈশ্বিক বাজারে অন্যায্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।
অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত বাণিজ্য চাপ প্রয়োগের উদ্যোগ। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ওপর শর্ত আরোপ করে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, শ্রম অধিকারের বিষয়েও বাংলাদেশের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন প্রস্তাব নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি বাংলাদেশ সরকার।
নতুন প্রস্তাবে কী আছে
ইউএসটিআর জানিয়েছে, জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং শ্রম মানদণ্ড বাস্তবায়নে ঘাটতির কারণে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভারত, পাকিস্তান, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, জাপানসহ আরও অনেক দেশ রয়েছে।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে কার্যকর আইন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে যেসব দেশ আংশিকভাবে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করেছে, তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম হারে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মেক্সিকো, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক এবং অন্য দেশের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া একটি টেক্সটাইল মেকানিজম চালুর প্রস্তাবও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য তুলনামূলক কম শুল্কে আমদানি করা হতে পারে। তবে এই মেকানিজমের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

কোন পণ্য শুল্কের বাইরে থাকবে
ইউএসটিআর জানিয়েছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতকে এই শুল্ক কাঠামোর বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি খাত, বিরল খনিজ, নির্দিষ্ট ধাতু, গরুর মাংস, কফি, নির্দিষ্ট ফল ও সবজি, ওষুধ, জৈব রাসায়নিক এবং বিমানের যন্ত্রাংশ।
এই সিদ্ধান্তকে বিশ্লেষকরা আংশিকভাবে কৌশলগত বলছেন, কারণ এসব খাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক কৌশলের পরিবর্তন
২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর পালটা শুল্ক আরোপ করে। শুরুতে বাংলাদেশের ওপর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক নির্ধারণ করা হলেও পরে আলোচনার মাধ্যমে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর নতুন মার্কিন শুল্ক
তবে এই শুল্ক নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। পরে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফকে অবৈধ ঘোষণা করলে প্রশাসন বিকল্প শুল্ক কাঠামোর দিকে যায়।
এরপর সেকশন ১২২ নামে একটি আইনি কাঠামোর আওতায় নতুন শুল্ক ব্যবস্থা এবং তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে ইউএসটিআর।
এই তদন্তে মূলত দেখা হচ্ছে, কোনো দেশ জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করছে কি না এবং সেই কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে কি না। একই সঙ্গে অতিরিক্ত উৎপাদন বা সক্ষমতার বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
জোরপূর্বক শ্রম এবং অতিউৎপাদন ইস্যুকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র যখন ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল, তখনই এ নিয়ে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল।
এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ভিন্ন কৌশলে বাড়তি শুল্ক আরোপের পথই খোলা রাখছে বলেও সমালোচনা হয়েছিল।
মঙ্গলবার নতুন শুল্ক আরোপের যে প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর দিয়েছে, তার মধ্য দিয়ে সেই কৌশলেরই বাস্তবায়ন দেখছেন অর্থনীতিবিদ এবং রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলছেন, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন কোনো পরিকল্পনা নয়, বৃহৎ পরিকল্পনারই অংশ।
তিনি বলছেন, ট্যারিফ আদায়ের যে পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে নিয়েছিল, সেটিই আইনের মারপ্যাঁচে ভিন্ন আঙ্গিকে নতুনভাবে সামনে আনা হয়েছে।
অতীতে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া ট্যারিফের সিদ্ধান্ত আদালতে বাতিল হলেও সেটাকেই আবার শক্ত করে আইনি প্রক্রিয়ায় আনা হচ্ছে।

ওরা বলছে যে আপনি ফোর্সড লেবার এবং এক্সেস প্রোডাকশনের জন্য দায়ী, এগুলো তো খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার। এগুলো আপনি প্রমাণ করতে পারবেন না, ওরাও পারবে না। আসলে ওরা যে মাত্রায় ট্যারিফ কালেকশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আইনের মারপ্যাঁচে সেটাই করছে, বিবিসি বাংলাকে বলেন রুবেল।
এছাড়া যে দেশগুলো এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি করেনি, তাদেরকেও চুক্তিতে আনার ক্ষেত্রে এটি একটি আইনি ভিত্তি হিসেবেও কাজ করবে।
জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে যেসব দেশে বাড়তি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের নাম থাকায় এর প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠন।
বুধবার দুপুরেই সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ।
সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলছেন, মার্কিন আদালত আগের ট্যারিফ বাতিল করলেও নতুন অজুহাতে আরও ট্যারিফ আরোপের চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন: পোশাক শিল্পের পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের?
জোরপূর্বক শ্রমের যে অজুহাত তারা দিয়েছে, এর একটা প্রমাণও কি তারা দিতে পারবে? বাংলাদেশের শ্রমিকদের জোর করে কাজ করানো হচ্ছে—প্রশ্নই আসে না, বলেন তিনি।
মোহাম্মদ হাতেম দাবি করেন, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করেই কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে।
আইএলও’র আন্তর্জাতিক শ্রম কনভেনশনের দশটি কোর কনভেনশনের সবগুলোতেই বাংলাদেশ সই করেছে। আমেরিকা মাত্র দুটিতে করেছে। মূলত তাদের আদালত বাতিল করে দেওয়ায় ভিন্ন একটি ক্লজে গিয়ে এটি করার চেষ্টা করছে তারা, বলেন বিকেএমইএ সভাপতি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ট্যারিফ ইস্যুতে বাংলাদেশের যে চুক্তি হয়েছে, সেটি আবারও পর্যালোচনার কথা বলছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, স্বাভাবিক শুল্কের ওপর লেবার স্ট্যান্ডার্ডের ইস্যু এনে তারা বাড়তি শুল্ক আরোপের চেষ্টা করছেন। কিন্তু আগেই এ ধরনের শুল্কের বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল মার্কিন আদালত, এবারও বিষয়টি মার্কিন আদালতে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
যদিও তিনি মনে করেন, মার্কিন ট্যারিফের দিকে না তাকিয়ে বাংলাদেশের বরং উচিত হবে শ্রম অধিকারের বিষয়ে যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, সেখানে নজর দেওয়া।
শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতের বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন আগে থেকেই আমাদের ওপর চাপ রয়েছে। আমাদের উচিত হবে ট্যারিফের দিকে না তাকিয়ে, এ ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকলে নিজেদের তাগিদেই সেটি ঠিক করা, বিবিসি বাংলাকে বলেন মোয়াজ্জেম। সূত্র: বিবিসি বাংলা
এআর