জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০১ জুন ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হোসেনের কক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠককে কেন্দ্র করে সোমবার মতিঝিলে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বোর্ড সভা আয়োজনের জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ তোলেন বিক্ষোভকারীরা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বৈঠক চলাকালে কক্ষে ঢুকে পড়েন আন্দোলনকারীদের একটি অংশ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে তার নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহালের দাবিতে সকাল থেকেই ব্যাংক ভবনের সামনে গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের বিক্ষোভ চলছিল। এর মধ্যেই ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডির কক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক শুরু হলে আন্দোলনকারীদের মধ্যে সন্দেহ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পূর্বনির্ধারিত বোর্ড সভা আয়োজনের জন্য ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর বিভিন্ন মহল থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বোর্ড সভা আয়োজনের তাগিদ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ সময় এমডির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকরাও ভেতরে প্রবেশ করে ভারপ্রাপ্ত এমডির কাছে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান।
এসময় ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি বিবেচনায় অনলাইনে বোর্ড সভা আয়োজনের অনুমতি দিয়েছিল। তবে গ্রাহকদের আন্দোলন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।
ব্যাংকটির বিভিন্ন সূত্র জানায়, সোমবার রাত পর্যন্ত বোর্ড সভা আয়োজনের চেষ্টা চললেও আন্দোলনের কারণে তা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র সংক্রান্ত বিষয়ও অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।
এদিকে নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগের প্রতিবাদে দিনভর দফায় দফায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডাররা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই নিয়োগের মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। তারা চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল, সাবেক এমডিকে পুনর্বহাল এবং ব্যাংকটির পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে, এতে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। তবে আহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে বলেন, কোনো নিয়োগ বা সিদ্ধান্ত আন্দোলনের চাপে নেওয়া হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক আইন ও বিধি অনুযায়ী নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় অনলাইনে বোর্ড সভার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, ব্যাংকপাড়া এলাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার স্বার্থে আন্দোলনকারীদের সরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম শারীয়াহভিত্তিক এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তৎকালীন কিছু সৎ ও দক্ষ মানুষের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই ব্যাংক খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু ব্যাংকটির এই সাফল্যে কু-নজর পড়ে কালো শকুনের। ২০১৭ সালে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্টায়ত্ত গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপে মূল উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ব্যাংকটি ছিনিয়ে নেয় লুটেরা গোষ্ঠী এস আলম। এস আলমের সীমাহীন লুটপাটে দুর্বল হয়ে পড়ে ব্যাংকটি। স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর পালিয়ে যায় ব্যাংক লুটেরারাও। পাঁচ আগস্ট পরবর্তী কিছুটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকলেও এখন আবারও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
টিএই/এফএ