মোস্তাফিজুর রহমান
৩০ মে ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
ডেমরা সড়ক থেকে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ঢোকার মুখে বাম পাশে কয়েকজন মানুষ বসে আছেন। তাদের সামনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে গরু ও মহিষের লিঙ্গ (বুলস্টিক)। কেউ সংগ্রহ করে আনছেন, কেউ কিনছেন, আবার কেউ চর্বি ছাড়িয়ে পরিষ্কার করছেন। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন দৃশ্য এখন বেশ পরিচিত।
প্রথমে পরিচয় জানতে চাইলে কেউ কথা বলতে রাজি হননি। এগুলো কী কাজে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়েও মুখ খোলেননি। তবে জানা গেল, প্রতিটি বুলস্টিক ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে কিনছেন তাঁরা। ঈদের দিন তাজা অবস্থায় থাকলে দাম উঠেছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত।
শুক্রবার বিকেলে আবার সেখানে গিয়ে পরিচয় গোপন রেখে কথা বললে এক ক্রেতা জানান, ষাঁড়গরুর এই অঙ্গকে তাঁরা স্থানীয়ভাবে ‘লতা’ নামে চেনেন। কেউ কেউ আবার ‘বইক্কা’ বলেও ডাকেন।
আফজাল হোসেন (ছদ্মনাম) বলেন, ‘প্রতি বুলস্টিক ৩০ টাকা করে কিনছি। আকার বড় হলে ৪০ টাকা দিচ্ছি। আর একেবারে তাজা হলে ৭০ থেকে ৮০ টাকাও দিতে হচ্ছে।’
আরেক ক্রেতা আফসান (ছদ্মনাম) বলেন, তিনি এগুলো কিনে কিছু লাভে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য, পরে সেগুলো বিদেশে রফতানি করা হয়। শুনেছেন, চীনেও যায় এসব পণ্য।
এই ক্রেতাদের কাছে ২৩টি বুলস্টিক বিক্রি করেছেন যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা চঞ্চল (২৮)। শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, অনেক জায়গায় এসব কেনাবেচা হয়। তবে মাতুয়াইলে দাম বেশি পাওয়া যায় বলেই তিনি এখানে নিয়ে এসেছেন।
চঞ্চলের দাবি, ২৩টি বুলস্টিক বিক্রি করে তিনি এক হাজার টাকা পেয়েছেন। অন্য কোথাও বিক্রি করলে ৫০০ টাকাও মিলত না।
ভালো দামের আশায় পুরান ঢাকা থেকে বুলস্টিক সংগ্রহ করে এনেছেন ভিরুজ (৪২)। তিনি বলেন, ৩৪টি সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে কিছু ১০ থেকে ২০ টাকা দরে কিনেছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গরুর বুলস্টিক সংগ্রহ করছেন অনেকেই। এবার ঢাকায় প্রায় ৯ লাখ পশু কোরবানি হচ্ছে, যার বড় অংশই ষাঁড় গরু। ফলে বিপুল পরিমাণ বুলস্টিক সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, একটি বুলস্টিকের ওজন সাধারণত ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম হয়। মাঠপর্যায়ে ৩০ থেকে ৮০ টাকায় কেনাবেচা হলেও সংগ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা এগুলো ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে কিনে নেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, গরু ও মহিষের বুলস্টিক শুকিয়ে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। চীনে এটি স্যুপ তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে জানা যায়। পাশাপাশি কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণীর খাবার তৈরিতেও এর ব্যবহার রয়েছে। এ কারণে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে এর চাহিদা রয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গরু ও মহিষের বুলস্টিক কয়েকটি দেশে রফতানি হচ্ছে। এই অপ্রচলিত পণ্যকে ঘিরে দেশে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিবছর এ খাত থেকে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২–২৩ ও ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৫০ কোটির টাকার বেশি গরু ও মহিষের বুলস্টিক রফতানি হয়েছে। বছর বছর এই বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বুলস্টিক এখন রফতানিযোগ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে কোরবানির সময় অনেকেই এটি ফেলে দেন। এ বিষয়ে সরকারি প্রচারণা বাড়ানো গেলে একদিকে পরিবেশদূষণ কমবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও বাড়বে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পরিবেশবাদী নেতা প্রকৌশলী আবদুস সোবহান বলেন, গরু ও মহিষের লিঙ্গ (বুলস্টিক) ছাড়াও হাড়, চর্বিসহ আরও অনেক উপকরণ মানুষ ফেলে দেয়। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হয়। অথচ এসবই অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান সম্পদ। যথাযথ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এগুলো রফতানি করে আয় করা সম্ভব। এ জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
এএম/এআর