images

অর্থনীতি

চামড়ার বাজারে এবারো ধস, ‘কাগজেই সীমাবদ্ধ’ সরকারি দর

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

২৯ মে ২০২৬, ১০:১৯ এএম

কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারো দাম নির্ধারণ করেছিল সরকার। এবার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। তবে বাস্তবে বাজারে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কমে। এতে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও এতিমখানা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করে থাকে বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানা। অনেক কোরবানিদাতাই স্বেচ্ছায় তাদের পশুর চামড়া এসব প্রতিষ্ঠানে দান করেন। এই চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়েই মূলত লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিমখানা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও অন্যান্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়।

তবে কয়েক বছর ধরেই চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ছে। দাম কম থাকায় মাদরাসাগুলোর মধ্যেও চামড়া সংগ্রহে কিছুটা অনীহা দেখা যাচ্ছে।

রাজধানীর মগবাজার, মুগদা, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব, শেওড়াপাড়া ও লালবাগের পোস্তা ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়, মাঝারি আকারের চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ সরকার ঘোষিত দরে একটি মাঝারি আকারের চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। একইভাবে বড় আকারের চামড়ার সম্ভাব্য মূল্য ছিল প্রায় ২ হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকার বেশি।

মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সেই দামে চামড়া কেনার কোনো নিশ্চয়তা তারা পাননি। ফলে শুরু থেকেই বাজারে কম দামের প্রভাব পড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি থেকে যে দর নির্ধারণ করা হয়, তার ভিত্তিতেই তারা মাঠপর্যায়ে চামড়া কেনাবেচা করেন। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়েন কোরবানিদাতা ব্যক্তি, মসজিদ-মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো।

বৃহস্পতিবার দুপুরে মালিবাগ এলাকা থেকে ১৫ পিস গরুর চামড়া বিক্রির জন্য নিয়ে যান মৌসুমি ব্যবসায়ী জাফর। তিনি প্রতি পিস চামড়ার দাম ১ হাজার টাকা চাইলে ব্যবসায়ীরা ৬৫০ টাকার বেশি দিতে রাজি হননি। পরে তিনি দাম কমিয়ে ৮০০ টাকা করলেও ক্রেতা মেলেনি।

জাফর বলেন, ‘গত বছর এই ধরনের চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার সবাই ৬০০-৬৫০ টাকার বেশি বলতে চাচ্ছে না। সরকার দাম বাড়ালেও বাজারে তো তার কোনো প্রভাব নেই।’

রাজধানীর অন্যান্য এলাকার চিত্রও ছিল একই। মোহাম্মদপুরের শেরশাহ সুরি রোডে মৌসুমি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ স্বপন জানান, তিনি ছোট কাঁচা চামড়া ৪৫০ টাকায়, মাঝারি চামড়া ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় এবং বড় চামড়া ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় কিনেছেন।

স্বপনের ভাষ্য, ‘আমরা ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে যে দাম পাচ্ছি, সে অনুযায়ী কিনছি। বেশি দামে কিনলে লোকসান হবে।’

সায়েন্স ল্যাব এলাকার আরেক ব্যবসায়ী আবিদ হোসেন হানিফও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় চামড়ার দাম কমেছে। তবে তাদের কিছু করার নেই। কারণ ট্যানারিতে কম দামেই চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে।

গরুর মতো ছাগলের চামড়ার বাজারেও ধস নামে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতি পিস ছাগলের চামড়া ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো দাম ছাড়াই চামড়া নিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

ধানমন্ডির এক ব্যবসায়ী জানান, ছাগলের চামড়া এখন অনেকের কাছে ‘বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ সংরক্ষণ খরচ তুলতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।

চামড়ার বাজারে এই অস্থিরতার বড় ভুক্তভোগী দেশের মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো। কারণ অনেক মাদরাসার খরচের বড় একটা অংশ আসে প্রতিবছর কালেকশন হওয়া চামড়া বিক্রি থেকে। কিন্তু পর্যাপ্ত দাম না থাকায় তারাও চামড়া সংগ্রহকে ঠিকমতো গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

মিরপুর আরজাবাদ মাদরাসার (জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ) বর্তমান মুহতামিম বা অধ্যক্ষ হলেন মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সরকার চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করে থাকে, এটা মূলত ‘ভেলকিবাজি’, যা বাস্তবে কার্যকর হয় না। এবারও হচ্ছে না। আমরা যে চামড়া সংগ্রহ করি সেটার ন্যায্যমূল্য পাই না। অনেকেই চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছেন।’
খিলগাঁওয়ের নাজমুল হক মদিনাতুল উলুম কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাহবুবুল্লাহ বলেন, ‘চামড়া এ দেশের জাতীয় সম্পদ। অথচ প্রতি বছর পরিকল্পিতভাবে এই খাতকে ধ্বংস করা হচ্ছে। চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

যদিও ট্যানারি মালিকরা দাম কমার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ’র দাবি, গত বছরের তুলনায় চামড়ার দাম কমেনি, বরং ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে।

সাখাওয়াতের ভাষ্য, ‘আমি নিজেই ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দামে চামড়া কিনেছি। বাজার পুরোপুরি জমতে সময় লাগে। বিকেল থেকে সন্ধ্যার পর দাম আরও বাড়তে পারে।’

তিনি আরো বলেন, রাজধানীর কাঁচা চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখতে অনেক ট্যানারি এবার সরাসরি মাঠপর্যায়ে চামড়া কিনছে। তবে দুপুর পর্যন্ত কেনাবেচা জমে না ওঠায় কোথাও কোথাও কম দামে বিক্রি হয়ে থাকতে পারে।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর পোস্তা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সন্ধ্যার পর চামড়ার বাজার কিছুটা জমে উঠলেও দামে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। বড় আকারের চামড়া ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায়, মাঝারি আকারের চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় এবং ছোট চামড়া ১৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। এর বিপরীতে প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার পশু।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার কোরবানির সংখ্যা কিছুটা কম হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই ট্যানারি মালিকরা এবার ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় কম।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, চামড়ার বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের অস্বচ্ছতা কাজ করছে। সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দাম কার্যকর করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

মাঠপর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ট্যানারি ও বড় আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা বাধ্য হয়েই কম দামে চামড়া কিনছেন এবং বিক্রি করছেন।

চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করতে লবণ, শ্রমিক ও পরিবহন মিলিয়ে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা খরচ হয়। সে হিসাবে সরকারি নির্ধারিত দাম অনুযায়ী বাজারে যে দর থাকার কথা, বাস্তবে তার অর্ধেকেরও কমে বিক্রি হচ্ছে অধিকাংশ চামড়া।

তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর ঈদের আগে সরকার দাম ঘোষণা করলেও বাজার তদারকিতে কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না। ফলে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন।

টিএই/এমআর