নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ মে ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে আসন্ন অর্থবছরে তামাকজাত দ্রব্যে ‘অ্যাড ভ্যালোরেম’ (মূল্য অনুসারে) সম্পূরক শুল্কের পাশাপাশি অতিরিক্ত সুনির্দিষ্ট করারোপের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইমা হক বিদিশা। তিনি বলেন, বর্তমানে যে কর হার রয়েছে তা যথেষ্ট ও যৌক্তিক। কিন্তু কর হার না বাড়িয়ে শুধু দাম বাড়ানো হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা কিংবা রাজস্ব বৃদ্ধিতে কার্যকর অবদান রাখবে না, বরং তামাক কোম্পানিগুলোর মুনাফা আরও বাড়বে।
শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিএমএ ভবনের ডা. মিলন সভাকক্ষে ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর তামাক কর কাঠামো’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক বিদিশা এসব বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক, বিইআরের তামাক কর প্রকল্পের ফোকাল পার্সন ও বিএনটিটিপির টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক ড. রুমানা হক। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব ও ডিপিডিসির চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান খান। বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদ।
অধ্যাপক সাইমা হক বিদিশা বলেন, তামাকপণ্যের ওপর অ্যাড ভ্যালোরেম সম্পূরক শুল্কের পাশাপাশি যেকোনো হারে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা জরুরি। কারণ শুধু মূল্য বৃদ্ধি করলে কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত মুনাফা করবে, কিন্তু তামাক ব্যবহার কমবে না। কার্যকর করনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা কমানো সম্ভব।
অনুষ্ঠানে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের তামাক কর প্রস্তাব ও মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এসএম আব্দুল্লাহ। প্রস্তাবে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য প্রিমিয়াম স্তরে ২০০ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা এবং মধ্যম ও নিম্ন স্তর একীভূত করে ১০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। একইসঙ্গে সব স্তরে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা এবং প্রতি ১০ শলাকায় অতিরিক্ত ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া প্রিমিয়াম স্তর ছাড়া অন্য স্তরগুলোর মূল্য থেকে ‘ও তদূর্ধ’ শব্দ বাদ দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়। বিড়ির ক্ষেত্রে ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিভাজন তুলে দিয়ে সুনির্দিষ্ট শুল্ক ব্যবস্থার আওতায় ২০ শলাকার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ এবং ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
জর্দা ও গুলের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৬০ টাকা এবং প্রতি ১০ গ্রাম গুলের মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ করে উভয় ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়। পাশাপাশি তামাকজাত সব পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়। একইসঙ্গে তামাক পাতা রফতানিতে ২৫ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক পুনর্বহালের আহ্বান জানানো হয়।
ড. মো. এনামুল হক বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে সরকারের দ্রুত একটি জাতীয় তামাক করনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা জরুরি। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত কর কাঠামো বাস্তবায়ন করা হলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছেড়ে দিতে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ নতুন করে ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে। একইসঙ্গে ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
হামিদুর রহমান খান বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো প্রাণঘাতী পণ্যের ব্যবসা করে বিপুল মুনাফা করছে এবং নিজেদের স্বার্থে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। তাই সরকারের উচিত একটি টেকসই ও সমন্বিত তামাক করনীতি প্রণয়ন করা।
বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদ বলেন, দেশে তামাক চাষ ও উৎপাদন আগের তুলনায় বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তিনি বলেন, তামাক চাষের কারণে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশে তামাক চাষের কারণে বছরে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
সভাপতির বক্তব্যে ড. রুমানা হক বলেন, সরকার খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কঠোর হলেও তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও কর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নানা ধরনের টালবাহানা করছে। আদালতের আদেশ অমান্য করে দেশে নতুন করে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের অনুমোদন দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে উল্লেখ করে তিনি সরকারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনটিটিপির প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সিনিয়র কমিউনিকেশন অফিসার ইব্রাহীম খলিল।
এএইচ/ক.ম