মহিউদ্দিন রাব্বানি
২৩ মে ২০২৬, ০৭:৩৫ এএম
# হাটে পর্যাপ্ত পশু, এখনো জমেনি বেচাকেনা
# ক্রেতার চেয়ে উৎসুক জনতার ভিড় বেশি
# বৃষ্টি মোকাবেলায় ত্রিপল-প্যান্ডেলের প্রস্তুতি
# শেষ সময়ে জমবে, আশা ব্যবসায়ীদের
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাটগুলো ধীরে ধীরে জমে উঠছে। যাত্রাবাড়ীর কাজলা-শনিরআখড়া হাটেও এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে প্রস্তুতি, পশু আনা-নেওয়া এবং হাট সাজানোর কাজ। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকভর্তি গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া আসতে শুরু করেছে। তবে এখনো পুরোদমে কেনাবেচা শুরু হয়নি। হাটে আসা বেশির ভাগ মানুষ পশু দেখছেন, দামদর জেনে যাচ্ছেন, তবে চূড়ান্ত কেনাকাটা করছেন না।
সরেজমিনে বৃহস্পতি ও শুক্রবার (২১-২২ মে) দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী-ডেমরা সড়কের কাজলা ব্রিজ থেকে মৃধাবাড়ি এবং শনিরআখড়া আন্ডারপাস থেকে মৃধাবাড়ি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অস্থায়ী পশুর হাট গড়ে উঠেছে। সড়কের দুপাশে সারি সারি গরু বাঁধা। কোথাও ট্রাক থেকে পশু নামানো হচ্ছে, কোথাও আবার খামারিরা পশুর যত্ন নিচ্ছেন। একদিকে শ্রমিকরা বাঁশ পুঁতে ছাউনি ও প্যান্ডেল নির্মাণ করছেন, অন্যদিকে নতুন নতুন পশু এসে পৌঁছাচ্ছে হাটে।
হাট ঘুরে দেখা যায়, এবার বর্ষা মৌসুম হওয়ায় বাড়তি প্রস্তুতি নিয়েছেন ইজারাদার ও ব্যবসায়ীরা। বৃষ্টি থেকে পশু ও খামারিদের সুরক্ষায় বড় বড় ত্রিপল টানানো হচ্ছে। নিচু জায়গাগুলোতে পানি জমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় সেখানে বালু ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি খড়, পলিথিন, রেকসিন ও কাঠের অস্থায়ী মাচা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী পানির পাম্প পর্যন্ত অব্যবহৃত খালি জায়গার ইজারা পেয়েছেন কে বি ট্রেডের প্রোপাইটর মো. শামীম খান। তিন কোটি ৬৫ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা নিয়েছেন।
হাটে গরু নিয়ে এসেছেন সিরাজগঞ্জের খামারি আবু হানিফ। তিনি বলেন, এবার গরু পালনে খরচ অনেক বেড়েছে। খাবার, ওষুধ, পরিবহন সবকিছুর দাম বেশি। তারপরও লাভের আশায় গরু নিয়ে এসেছি। এখনো মানুষ কম আসছে। যারা আসছে তারা শুধু দেখে যাচ্ছে, দাম জিজ্ঞেস করছে।
সিরাজগঞ্জ থেকে আসা অপর ব্যবসায়ী জোয়াদ্দার বলেন, আমরা তিন দিন আগে গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছি। এবার বৃষ্টির ভয় আছে, তাই ত্রিপল থাকায় কিছুটা সুবিধা হচ্ছে। তবে বিক্রি এখনো শুরু হয়নি। আশা করছি ঈদের তিন-চার দিন আগে ভালো ক্রেতা আসবে।
কুষ্টিয়া থেকে আসা আরেক খামারি সামছুল হক বলেন, গত বছর শেষ মুহূর্তে ভালো দাম পেয়েছিলাম। এবারও সেই আশা নিয়েই এসেছি। এখন বাজার শান্ত আছে। মানুষ দাম শুনে যাচ্ছে। আসল বেচাকেনা এখনো বাকি।
এদিকে হাটে শুধু ক্রেতাই নন, উৎসুক দর্শনার্থীদের ভিড়ও বাড়ছে। বিকেলের পর পরিবার নিয়ে অনেকে পশুর হাটে ঘুরতে আসছেন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে গরু দেখার বাড়তি আগ্রহ দেখা গেছে। কেউ মোবাইলে ছবি তুলছেন, কেউ আবার বিশাল আকৃতির গরু দেখে ভিড় করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল আলম বলেন, বাচ্চাদের নিয়ে গরু দেখতে এসেছি। এখনো কেনার সিদ্ধান্ত নিইনি। কয়েক দিন পরে আবার আসবো। তবে এবার গরুর দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে।
কলেজ শিক্ষার্থী সিয়াম মাহমুদ বলেন, প্রতি বছর বন্ধুদের নিয়ে হাটে আসি। বড় বড় গরু দেখতে ভালো লাগে। এবার হাটের পরিবেশ সুন্দর লাগছে। ত্রিপল দেওয়ায় রোদ ও বৃষ্টি থেকে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে।
হাটের কয়েকজন শ্রমিক জানান, দিন-রাত কাজ করেও এখনো পুরো প্রস্তুতি শেষ হয়নি। আলোর সংযোগ, ড্রেনেজব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত ছাউনি তৈরির কাজ চলছে। বৃষ্টি হলে যাতে কর্দমাক্ত পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
হাটে আসা কয়েকজন ক্রেতা অভিযোগ করেন, প্রতি বছর পশুর দাম শুরুতে বেশি চাওয়া হয়। পরে ঈদ ঘনিয়ে এলে দাম কিছুটা কমে আসে। তাই অনেকেই এখনো অপেক্ষা করছেন। ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বাজার পুরোপুরি বুঝতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।
জানা গেছে, কাগজে-কলমে রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাট পাঁচ দিনের জন্য ইজারা দেওয়া হলেও বাস্তবে ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই অনেক হাট বসে যায়। আবার ঈদের পরও কিছু হাট চালু থাকে। এবারও নির্ধারিত সময়ের আগেই পশু আসা শুরু হয়েছে। যদিও বিষয়টি ইজারার শর্তের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এবারের ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৮ মে বৃহস্পতিবার। ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে ইতোমধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা খামারি ও ব্যবসায়ীরা যেমন ভালো বেচাকেনার অপেক্ষায় আছেন, তেমনি রাজধানীবাসীও শেষ সময়ে পছন্দের পশু কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং শেষ সময়ে ক্রেতার চাপ বাড়লে এবার কোরবানির পশুর বাজার গত বছরের তুলনায় আরও প্রাণবন্ত হবে। এখনো বেচাকেনা ধীরগতির হলেও হাটের পরিবেশ দেখে তারা আশাবাদী।
হাট ইজারাদার মো. শামীম খান ঢাকা মেইলকে বলেন, হাটের প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বৃষ্টির বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা আলাদা ব্যবস্থা নিয়েছি। পশু ও খামারিদের যেন কষ্ট না হয়, সেজন্য ত্রিপল, খড় ও বালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখনো মানুষ বেশি কিনছে না, তবে কয়েকদিন পর পুরো হাট জমে উঠবে।
ইজারাদার বলেন, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু আসছে। খামারিরা অনেক আশা নিয়ে রাজধানীতে আসেন। রাজধানীবাসীও সাধারণত শেষ সময়ের দিকে বেশি পশু কেনেন। তাই আমরা আশা করছি রোব ও সোমবার থেকে জমজমাট বেচাকেনা শুরু হবে।
এমআর/জেবি