মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
২১ মে ২০২৬, ০৮:৩৮ পিএম
দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। টানা আট মাস ধরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে আটকে থাকার পর চলতি বছরের মার্চ শেষে তা নেমে এসেছে ৫ শতাংশের ঘরে। একই সময়ে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগও গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি—সবকিছুর ওপরই চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এর আগে ঋণ প্রবৃদ্ধি কখনো এত কমেনি। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যেও এ প্রবৃদ্ধি সাড়ে সাত শতাংশের ওপরে ছিল। এছাড়া সবশেষ গত বছরের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে ছিল। ওই মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির হার কমছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। চলতি অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫২, আগস্টে নেমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৩৫, সেপ্টেম্বরে ৬ দশমিক ২৯, অক্টোবরে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে। এরপর নভেম্বর কিছুটা বেড়ে ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ দাঁড়ায়। কিন্তু ডিসেম্বরে তা নেমে আসে ৬ দশমিক ২০ শতাংশে। এরপর জানুয়ারিতে ৬ দশমিক ০৩ এবং ফেব্রুয়ারিতেও সেটি ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে স্থির থাকে, তবে মার্চে এসে তা হঠাৎ করেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৪ দশমিক ৭২ শতাশে নেমে আসে।
আরও পড়ুন
সংকটে স্বস্তির বাজেটের খোঁজে সরকার
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি খাতে বর্তমানের ঋণ প্রবৃদ্ধি এযাবৎকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। সুদহার বিবেচনায় নিলে প্রকৃতপক্ষে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক। কেননা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হিসাব করা হয় সুদহার যোগ করে। গত মার্চে ব্যাংকগুলো গড়ে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। ঋণ ও আমানতে সুদহারের গড় ব্যবধান (স্প্রেড) ছিল ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়ার এই প্রবণতার অর্থ হলো শ্রমবাজারে প্রতিবছর যুক্ত হওয়া বিপুলসংখ্যক তরুণ কাজ পাচ্ছেন না। এর প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, নির্বাচনের পর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এখনো দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি। জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, প্রশাসনিক হয়রানি ও বৈশ্বিক অস্থিরতা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ না থাকলে বেসরকারি খাতের ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়বে না, ফলে কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি বিনিয়োগ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর কাছে এখন তারল্যের কোনো সংকট নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এ পর্যন্ত বাজার থেকে প্রায় ৬১৪ কোটি ডলার কিনে ব্যাংকগুলোকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। আবার সরকারের ঋণও বাজেট নির্ধারিত সীমার মধ্যে আছে। এরপরও ঋণ বৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। একটি সময় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে ছিল। তবে করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর কলকারখানা বন্ধসহ নানা কারণে অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসে। এরপরও ২০২০ সালে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এরপর আবার বেড়ে দুই অঙ্কে ওঠে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রবৃদ্ধি আবার এক অঙ্কে তথা ৯ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে আসে। সেখান থেকে কমতে কমতে গত বছরের মার্চে ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশে আসে। এখন তা আরও কমে এসেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ঢাকা মেইলকে বলেন, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া হতাশাজনক। তবে দেখতে হবে কেন ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাবে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমেছে। তবে বর্তমান সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বন্ধ কল-কারখানা চালু করার। সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে স্থবিরতা থাকবে না।
টিএই/জেবি