নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ মে ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম
আসন্ন জাতীয় বাজেটকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং বৈষম্য কমিয়ে দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের উন্নয়নের নৈতিক দলিল হিসেবে প্রণয়ন করার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। তারা বলেছেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আজ বুধবার (২০ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব বলেন বক্তারা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল ও সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সের ডিন অধ্যাপক ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম।
এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন সংসদ সদস্য নূরুন্নিসা সিদ্দিকা, সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, সাবেক সচিব ও কৃষিবিদ ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ রুহুল আমিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও সিআইপিজির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোজাম্মেল হক। সঞ্চালনা করেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খুরশীদ আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে বরাদ্দকৃত অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় না। অনেক সময় হাসপাতালের ভবন নির্মাণ হলেও জনবল নিয়োগ না হওয়ায় যন্ত্রপাতি অকেজো পড়ে থাকে। শিক্ষাখাতেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মুসলিম চৌধুরী বলেন, বাজেটের আকার বাড়লেও কর আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অদক্ষতার কারণে সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি বিভাগগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে উপজেলা পর্যায়ে স্বতন্ত্র বাজেট ও পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, প্রচলিত ধারণায় বাজেট সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব হলেও বাস্তবে এটি অনেক সময় জনগণের সম্পদ ধনিকগোষ্ঠীর কাছে স্থানান্তরের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। তাই বাজেটকে একটি নৈতিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যা বৈষম্য বৃদ্ধি নয় বরং সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।
অধ্যাপক মাহবুবের মতে, সীমিত কৃষিজমির দেশে কৃষিখাতে বিশেষ বরাদ্দ অব্যাহত রাখা জরুরি। পাশাপাশি কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত আবাসন নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্যখাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিশু অপুষ্টির কারণে দেশে হামের প্রকোপ বাড়ছে। সুস্থ জাতি গঠনে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শিক্ষাখাতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া মানোন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সরকারি, বেসরকারি, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদরাসা ধারায় বিভক্ত হওয়ায় সমান দক্ষতা ও নাগরিক চেতনা তৈরি হচ্ছে না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ জরুরি বলে তিনি মত দেন।
অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম বলেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা উচ্চমূল্যের বেসরকারি ও অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত সরকারি সেবার মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ বহু পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলছে। স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ডেটাবেজ, টেলিমেডিসিন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কৃষিখাত নিয়ে অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ঋণের চাপ ও ন্যায্যমূল্যের অভাবে প্রান্তিক কৃষকরা সংকটে রয়েছেন। তাই জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি, আধুনিক সংরক্ষণাগার ও কৃষকবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদ সদস্য নূরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, দেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাজেটে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকা প্রয়োজন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকের নিরাপত্তা ও বাজারে চাঁদাবাজি বন্ধের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকদের কম বেতনের উদাহরণ তুলে ধরে বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
কৃষিবিদ ও সাবেক সচিব ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, কৃষি দেশের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষিসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন।
ডা. মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ক্রমেই পণ্যভিত্তিক হয়ে পড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে বিদেশে চিকিৎসা বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ও কমবে।
দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী বলেন, বাজেটের বিভিন্ন ভর্তুকি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। গবেষণার মাধ্যমে আগাম ফসল ঘরে তোলার উপযোগী জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হক বলেন, দেশের শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে বাস্তব চাহিদার সংযোগ দুর্বল। গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি জরুরি। একইসঙ্গে কৃষিজমি রক্ষা, ব্লু ইকোনমি ও বায়ো ইকোনমিতে বিনিয়োগ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এমআর/ক.ম