মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
১৭ মে ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
দেশে কয়েক বছর ধরে নানা শঙ্কার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ব্যাংকখাত। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নজিরবিহীন লুটপাটে বড় সংকটের মধ্যে পড়ে এই সেক্টর। এর পরও দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা, আমানত, রেমিট্যান্স আহরণ ও বিনিয়োগ সক্ষমতায় অনন্য অবস্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় ব্যাংকটির আকার, গ্রাহকভিত্তি, শাখা বিস্তৃতি এবং অর্থনৈতিক অবদান বর্তমানে বিস্ময়কর উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইসলামী ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকিং খাতের মোট আমানত প্রায় চার লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা, যার প্রায় ৩৯ শতাংশ এককভাবে ধারণ করছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অন্য শীর্ষ ব্যাংকগুলো যেখানে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাজার অংশীদারিত্ব অর্জন করতেই হিমশিম খায়, সেখানে ইসলামী ব্যাংকের এই অবস্থান দেশের আর্থিক খাতে শক্তিশালী আস্থার প্রতিফলন।
জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করছেন। দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যাংকটি আর্থিক সেবা পৌঁছে দিচ্ছে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। ব্যাংকটির রয়েছে ৪০০টি শাখা, ২৭৬টি উপশাখা এবং প্রায় ২ হাজার ৮০০ এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট। এই বিস্তৃত ভৌগোলিক নেটওয়ার্ক দেশের অন্য যেকোনো ব্যাংকের তুলনায় অনেক বড় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
বিশেষ করে রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশের প্রায় ২ কোটি প্রবাসীর মধ্যে অন্তত ৫০ লাখ প্রবাসী এই ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠান। ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৪ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় ১৯ শতাংশ বা প্রায় ৭৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এককভাবে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে। দ্রুত সেবা, বিশ্বস্ততা এবং শক্তিশালী বৈদেশিক নেটওয়ার্কের কারণে প্রবাসীদের কাছে ইসলামী ব্যাংক এখন আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময়েও ইসলামী ব্যাংক তার শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে থাকতে সক্ষম হয়েছে। পুরো ব্যাংকিং খাত যখন ডলার সংকটে চাপে ছিল, তখন ইসলামী ব্যাংক দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের ‘ধাক্কা সামালদাতা’ বা স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করেছে।
শিল্পখাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ইসলামী ব্যাংকের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, আত্মকর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে ব্যাংকটির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট ব্যাংকিংয়েও বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘সেলফিন’ শুধু একটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন শাখাবিহীন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকের বিনিয়োগ চাহিদা বিশ্লেষণ ও দ্রুত সেবা প্রদান আরো সহজ হবে।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায়ও ইসলামী ব্যাংক বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে রফতানিমুখী শিল্প, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং বহুমুখী বিনিয়োগ খাতে শরিয়াহভিত্তিক বন্ড বা ‘সুকুক’-এর মাধ্যমে বড় বিনিয়োগ আসতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগের অন্তত ১৫ শতাংশ ইসলামী ব্যাংকিং চ্যানেলের সুকুক থেকে আসবে।
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, গ্রাহক আস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, শক্তিশালী রেমিট্যান্স নেটওয়ার্ক এবং শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে ইসলামী ব্যাংক দেশের অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হুসাইন বলেন, আমাদের গ্রাহকরা কথায় নয় কাজে বিশ্বাস করেন। ইসলামী ব্যাংকের আমানত নিরাপদ। কাউকে চেক দিয়ে টাকা পায়নি তার কোনো নজির নেই। আমাদের বিশাল কর্মীবাহিনী গ্রাহকের জন্য নিবেদিত। গ্রাহকের চাওয়া পূরণ করাটা নিজেদের মনে করেন। সেজন্য ৩ কোটি গ্রাহক রয়েছে। তারা কারো কথায় বিশ্বাস করেন না।
তিনি আরো বলেন, মূলত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকের সঙ্গে অন্যদের তুলনা হয় না। আর আমাদের বোর্ডে গ্রাহকদের প্রাধান্য দিয়ে সব করা হয়। বর্তমান বোর্ড সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সময়মতো নীতি ও অন্যান্য পরামর্শ দিচ্ছে। ব্যাংক ঘুরে দাড়াচ্ছে। এই ব্যাংক জনতার ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। সেটা আস্থা, সেবা এবং কল্যাণকামী কার্যক্রমের কারণে সম্ভব হয়েছে। আশা করা যায়, ব্যাংকটি সেরা অবস্থান অটল রাখতে পারবে।
দেশের ব্যাংকখাতের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম শারীয়াহভিত্তিক এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। তৎকালীন কিছু সৎ ও দক্ষ মানুষের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই ব্যাংক খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। পর্যায়ক্রমে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ব্যাংকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে, আমানতকারী হিসেবে, বিনিয়োগ গ্রাহক হিসেবে, বিশেষ গ্রাহক হিসেবে কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে। সৎ পরিচালনা পর্ষদ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সততার দরুন আমানত-বিনিয়োগে একপর্যায়ে শীর্ষ অবস্থান লাভ করে ব্যাংকটি।
এ ব্যাংকটি বাংলাদেশের বেস্ট ব্যাংক, বেস্ট ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন হিসেবে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেকবার অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। কিন্তু ব্যাংকটির এই সাফল্যে কু-নজর পড়ে কালো শকুনের। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের হস্তক্ষেপে সৎ মানুষদের কাছ থেকে ব্যাংকটি ছিনিয়ে নেয় লুটেরা গোষ্ঠী এস আলম। এস আলমের সীমাহীন লুটপাটে দুর্বল হয়ে পড়ে ব্যাংকটি।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে প্রথম আলোচনা শুরু হয়। তবে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় সেই আলোচনা খুব বেশি দূর গড়ায়নি। এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করলে ইসলামী ব্যাংক দখলের জোর প্রচেষ্টা চালায়। এক পর্যায়ে নিবিড় তদারকির উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালে ব্যাংকটিতে চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ব্যাংকটি পুরোপুরি দখলে নেয় লুটেরা গোষ্ঠী।
ইসলামী ব্যাংক দখলের বর্ণনা দিতে গিয়ে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল মান্নান ‘ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ’ আয়োজিত এক ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে বলেন, ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ভোরে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) কয়েকজন কর্মকর্তা কচুক্ষেতের ডিজিএফআই কার্যালয়ে তুলে নিয়ে যায়। একইভাবে নিজ নিজ বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানকে। এরপর আমাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে ব্যাংকটি দখলে নেয় এস আলম গ্রুপ। ইসলামী ব্যাংকের একটি অব্যবহৃত প্যাডে লেখা পদত্যাগপত্রে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। কিন্তু সেই প্যাড ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলতি ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক কখনোই ব্যবহার করেনি। সে ধরনের একটি প্যাডে আমার পদত্যাগপত্র নেওয়া হয়েছে। ওই দিন অনেক রাত পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের স্যাররা অফিস করেছেন। তারা ওই দিনই ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করতে কাজ করেন।
পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর পালিয়ে যায় লুটেরা গোষ্ঠী ও তার দোসররা। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট লুটেরা গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে ব্যাংকটিতে।
টিএই/এফএ