images

অর্থনীতি

সরকারের তৃতীয় একনেক সভায় উঠছে ২৪ হাজার কোটি টাকার ১৬ প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ মে ২০২৬, ০১:০৫ এএম

চলতি অর্থবছরের ১১ম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক বসছে আজ। বুধবার (১৩ মে) বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমান। এটি বিএনপি সরকারের তৃতীয় একনেক সভা।

আজকের বৈঠকে দেশের অবকাঠামো ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৬টি বড় প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। অবকাঠামো উন্নয়ন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পগুলো প্রস্তুত করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তুত করা একনেক নোটিশে এসব তথ্য জানা গেছে। 

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের একনেক সভায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অবকাঠামো ও সংযোগ উন্নয়ন খাত। একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা, নদী রক্ষা, নগর সেবা সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রস্তাব করা হয়েছে।

একনেকে উপস্থাপিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ, সেতু নির্মাণ ও সংযোগ সড়ক উন্নয়নের কাজ করা হবে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় কমবে। বিশেষ করে শিল্প ও কৃষিপণ্য দ্রুত পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে।

সভায় উপস্থাপিত হতে যাওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে, চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত করা হচ্ছে। আধুনিক সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গড়ে তুলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হচ্ছে গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী। মে ২০২১ থেকে ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক গ্রন্থাগার অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলা শহরের বিদ্যমান মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোকে ৩০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্পও একনেকে উঠছে। জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৮ মেয়াদি এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়বে এবং জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সহজ হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩২৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয় নির্বাচন ডাটা সেন্টার, উপজেলা বা থানা, জেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের কার্যালয় এবং সার্ভার স্টেশন নির্মাণ প্রকল্প উপস্থাপন করবে। ডিজিটাল নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং তথ্য সংরক্ষণ নিরাপদ করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতায় হাই-টেক সিটি-২ এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীও অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে। জুলাই ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চলমান এ প্রকল্পের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমণি নিবাস নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীও একনেক সভায় উঠছে। এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আবাসন, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিমসটেক সচিবালয়ের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে নভেম্বর ২০২৮ মেয়াদি এ প্রকল্পের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে আন্তর্জাতিক মানের সচিবালয় ভবন নির্মাণ করা হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১২২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। 

স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন নির্মাণ প্রকল্পও একনেক সভায় উঠছে। আধুনিক প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের মাধ্যমে নগর সেবার কার্যক্রম এক জায়গা থেকে পরিচালনা করা হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২১৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। 

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সমস্যা নিরসনে চারটি এসএম ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পও তালিকায় রয়েছে। জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৮ মেয়াদি এ প্রকল্পের মাধ্যমে সেনা সদস্যদের আবাসন সুবিধা বাড়ানো হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। 

চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের চতুর্থ সংশোধনীও একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উঠছে। পতেঙ্গা থেকে সাগরিকা পর্যন্ত এই প্রকল্প চট্টগ্রামের যানজট নিরসন ও উপকূলীয় যোগাযোগ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩২৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। 

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলোর একটি হচ্ছে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়। জানুয়ারি ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ পর্যন্ত বাস্তবায়নযোগ্য এ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, নদী ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। 

এছাড়া বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পও একনেকে উঠছে। জানুয়ারি ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ মেয়াদি এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সেচব্যবস্থা উন্নয়ন করা হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। 

কৃষি খাতে বৃহত্তর যশোর জেলার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও সেচ এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।  

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে ভূমি সেবা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূমি সংক্রান্ত সেবা এক ছাদের নিচে আনার লক্ষ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪০৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। 

স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীও সভায় উপস্থাপন করা হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫১২ কোটি ০২ লাখ টাকা। 

বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় ময়মনসিংহ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য ঘোড়াশাল থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। 

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পগুলোর মধ্যে কয়েকটি বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নও রয়েছে কিছু প্রকল্পে। সভায় প্রকল্পগুলোর ব্যয়, বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অর্থায়ন কাঠামো এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।

একনেক নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে কয়েকটি বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এসব প্রকল্পে অর্থায়ন করবে। ফলে বৈদেশিক ঋণের শর্ত ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে এবার বিশেষ নজর দেওয়া হবে। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং তদারকির ব্যবস্থা রাখা হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পগুলোর মধ্যে অনেকগুলো সরাসরি জনগণের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে যোগাযোগ, পানি, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার খাতের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে নাগরিক সেবার মান বাড়বে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে।

এএইচ/এমআর