images

অর্থনীতি

বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে নতুন নির্দেশনা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

০৭ মে ২০২৬, ১১:২৩ পিএম

আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, এয়ারলাইন্স, শিপিং, পণ্য পরিবহন ও ট্যুর অপারেশন খাতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আরও স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত করতে নতুন সমন্বিত নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

বৃহস্পতিবার (৭ মে)  বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে টিকিট ইস্যু, বিদেশে অর্থ পাঠানো, পণ্য পরিবহন ভাড়া আদায়, ভ্রমণ প্যাকেজ বিক্রি, কুরিয়ার সেবা ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি অফিস পরিচালনার বিষয়ে বিস্তারিত বিধান দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অনুমোদন বা অনাপত্তিপত্র ছাড়া কোনো এয়ারলাইন্স বা ট্রাভেল এজেন্ট টিকিট ইস্যু করতে পারবে না। বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিদেশি নাগরিক, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব, বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ বা অগ্রিম টিকিট পরামর্শপত্রের মাধ্যমে টিকিট ইস্যুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে মানি চেঞ্জারের অর্থ ভাঙানোর সনদ গ্রহণযোগ্য হবে না বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জাহাজকর্মীদের বিদেশ যাত্রার ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। টিকিট ইস্যুর আগে বৈধ নাবিক পরিচয়পত্র, শিপিং মাস্টারের ছাড়পত্র এবং বিদেশি শিপিং কোম্পানির অর্থ পরিশোধের প্রমাণ যাচাই করতে হবে। বাংলাদেশি টাকায় কেনা আন্তর্জাতিক টিকিটের অর্থ বিদেশে ফেরত দেওয়া যাবে না বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি এয়ারলাইন্স ও শিপিং কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। বিদেশে মুনাফা পাঠানোর আগে স্থানীয় ব্যয়, কর, কমিশন ও সম্ভাব্য ফেরত অর্থ সমন্বয় করতে হবে। অব্যবহৃত টিকিটের বিপরীতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ অর্থ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এয়ারলাইন্সগুলোকে প্রতি মাসে টিকিট বিক্রি, পণ্য পরিবহন ভাড়া আদায়, অর্থ ফেরত, নগদ বুকিং ও ব্যাংক হিসাব বিবরণী জমা দিতে হবে। একইভাবে শিপিং কোম্পানিগুলোকে প্রতি তিন মাসে পণ্য পরিবহন ভাড়া, কমিশন, আয়কর ও ব্যয়ের বিবরণী দাখিল করতে হবে। আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য পরিবহন ভাড়া আদায়ে বিশেষ সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ডেমারেজ, ডিটেনশন ও পণ্য ওঠানামা খরচকে বিদেশি শিপিং লাইনের আয় হিসেবে গণ্য করা হবে। কর ও কমিশন কেটে অবশিষ্ট অর্থ বিদেশে পাঠানো যাবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রায় জ্বালানি ক্রয়, টিকিট বিক্রি ও পণ্য পরিবহন ভাড়া আদায়ের তথ্য অনলাইন প্রতিবেদনের আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও বাংলাদেশ বিমানের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাও নতুন নির্দেশনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিদেশি বন্দর বা স্টেশনে পরিচালন ব্যয় মেটাতে তারা পূর্বানুমতি ছাড়াই বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে পারবে। তবে নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে।

বিদেশি জাহাজ ও উড়োজাহাজ ভাড়ার ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ভাড়া বিদেশে পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, ভাড়ার চুক্তি, ব্যাংক সনদ ও আমদানি-রপ্তানির নথি যাচাই করতে হবে। অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো হলে তা দেশে ফেরত আনার লিখিত অঙ্গীকারও নিতে হবে।

কুরিয়ার সার্ভিস, রেলওয়ে কোম্পানি ও বিদেশি এজেন্সি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। স্থানীয় এজেন্টদের কমিশন, কর ও পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হবে। এজন্য নির্ধারিত ফরমে আয়-ব্যয়ের হিসাব ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সনদ জমা দিতে হবে।

পণ্য পরিবহন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বলা হয়েছে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো রপ্তানির ক্ষেত্রে টাকায় পণ্য পরিবহন ভাড়া পরিশোধ করতে পারবে। তবে বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে পাওয়া অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনতে হবে।

এ ছাড়া শিপিং কোম্পানি, এয়ারলাইন্স ও পণ্য পরিবহন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব হিসাবে রপ্তানি ও আমদানির বিপরীতে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা জমা রাখা ও বিদেশি ব্যয় মেটানো যাবে। সব লেনদেন নিয়মিতভাবে রিপোর্ট করতে হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ট্যুর অপারেটরদের জন্যও নতুন বিধান আনা হয়েছে। একজন ভ্রমণকারী তার বার্ষিক ভ্রমণ কোটার সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ ব্যবহার করে ভ্রমণ প্যাকেজ কিনতে পারবেন। বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে জমা হবে এবং এর বড় অংশ টাকায় রূপান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে মোট বিক্রির অন্তত ২৫ শতাংশ দেশমুখী ভ্রমণ প্যাকেজ হতে হবে।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি শাখা, প্রতিনিধি বা যোগাযোগ অফিস খোলার ক্ষেত্রেও নতুন প্রতিবেদন বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে এবং সব বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, নতুন এ নির্দেশনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিবহন, পর্যটন, এয়ারলাইন্স, শিপিং ও বৈদেশিক সেবা খাতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও জোরদার হবে।

টিএই/এআরএম