images

অর্থনীতি

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পোশাক খাতের উৎপাদন ব্যাহত: বিজিএমইএ পরিচালক

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক রুমানা রশীদ বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের পোশাক শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানির অনিয়মিত সরবরাহ ও ঘাটতির কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না, যা রফতানি খাতের প্রতিযোগিতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ড্যানিশ দূতাবাস এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় রুমানা রশীদ এসব বলেন। ‘বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সার্বভৌমত্ব: টেকসই ও স্থিতিস্থাপক ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এ আলোচনায় তিনি দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। 

রুমানা রশীদ বলেন, দেশের গার্মেন্ট খাত অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হলেও বর্তমানে এটি জ্বালানি সংকটের কারণে চাপে রয়েছে। তার ভাষায়, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক কারখানাকে বাধ্য হয়ে বিকল্প উৎসের দিকে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন সোলার সিস্টেম নিয়ে ভাবতে হচ্ছে, যাতে উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা যায়।

রুমানা রশীদ আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে, যা আগামী দিনে রপ্তানি বাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জনের ক্ষেত্রেও পরিবেশগত ও উৎপাদন মানদণ্ড পূরণ করা জরুরি হয়ে উঠছে। এসব শর্ত পূরণে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজসহ পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।

বিজিএমইএর এই পরিচালক বলেন, টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে হলে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। কারণ উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। এই ঘাটতি অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে রুমানা জানান, পোশাক খাত ইতোমধ্যে কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বিজিএমইএ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে ডিকার্বনাইজেশন কার্যক্রমে কাজ করছে। পাশাপাশি অনেক কারখানায় এনার্জি অডিট করা হচ্ছে, যেখানে ব্র্যাক, বিআইজিডি এবং ড্যানিডার মতো সংস্থাগুলো সহযোগিতা করছে। প্রায় ৫০০ কারখানায় এ ধরনের অডিট চলমান রয়েছে।

রুমানা রশীদ বলেন, সোলার বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ থাকলেও উচ্চ করহার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, সোলার প্যানেল, ইনভার্টার এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশের ওপর ট্যাক্স অনেক বেশি, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২৮ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। বিশেষ করে সোলার প্যানেলে প্রায় ২৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ইনভার্টারে প্রায় ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ কর রয়েছে। এই উচ্চ করহার কমানো হলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও লোন সুবিধা ব্যবহার করে কারখানাগুলো সহজেই এই খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে।

রফতানি বাজারে দেশের অবস্থান ধরে রাখতে হলে জ্বালানি স্থিতিশীলতার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিশেষ করে ইউরোপীয় ও অন্যান্য উন্নত বাজারে টেকসই উৎপাদন এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পোশাক খাত শুধু রফতানির জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। তাই এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তার মতে, জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা না থাকলে বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং রপ্তানি তিনটি ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। 

রুমানা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে রূপান্তর এখন সময়ের দাবি। তবে এ রূপান্তর সফল করতে হলে নীতিগত সহায়তা, কর সংস্কার এবং সহজ অর্থায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় গার্মেন্ট খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। জ্বালানি সংকট সমাধান করা গেলে পোশাক শিল্প আরও এগিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। এজন্য এখনই কার্যকর নীতি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

এএইচ/ক.ম