images

অর্থনীতি

জ্বালানি খাতকে লুণ্ঠনের ক্ষেত্র বানানো হয়েছে: ড. এম শামসুল আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

দেশের জ্বালানি খাতকে পরিকল্পিতভাবে লুণ্ঠনের ক্ষেত্র বানানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘নীতি, আইন এবং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ভেঙে পড়েছে, যার ফলে অযৌক্তিক ব্যয়, ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়ছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ড্যানিশ দূতাবাস এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত একটি গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সার্বভৌমত্ব: টেকসই ও স্থিতিস্থাপক ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এ আলোচনায় তিনি দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

শামসুল আলম বলেন, ‘জ্বালানি খাতে রিনিউয়েবল এনার্জির অংশগ্রহণ নিয়ে যে তথ্য দেওয়া হয়, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’ তার ভাষায়, কিলোওয়াট-আওয়ার ভিত্তিতে হিসাব করলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এক শতাংশেরও কম। অথচ নীতিগত লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ অর্জন করা, যা এখনো পূরণ হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি?

তিনি আরো বলেন, ‘২০০৮ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি গ্রহণের সময় যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা ছিল বাস্তবায়নের দিক থেকে অনেক দূরবর্তী। ২০২৬ সালে এসেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি নীতিগত ব্যর্থতার স্পষ্ট উদাহরণ। পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব ছিল।’

অধ্যাপক শামসুল আলম দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আইন নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। সংকট মোকাবিলার অজুহাতে প্রতিযোগিতা ছাড়াই বেসরকারি খাতে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত খাতে অস্বচ্ছতা ও অতিরিক্ত ব্যয় বাড়িয়েছে। এই আইন প্রথমে দুই বছরের জন্য আনা হয়েছিল, পরে বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি, বরং তা আরো বেড়েছে। এই নীতিগত কাঠামোর কারণে জ্বালানি খাতে ঘাটতি ও ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। 

তিনি আরো বলেন, সরকার এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের দিকে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর চাপের কারণে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কিস্তি ছাড়ের শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাতে রূপান্তরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা ভর্তুকি কমিয়ে মূল্য বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি করছে। এতে করে সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি চাপ বাড়ছে এবং জ্বালানি একটি সেবা খাত থেকে ব্যবসায়িক খাতে পরিণত হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এই খাতের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগানো যায়নি। বিশেষ করে জমি সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ কাঠামোর দুর্বলতা এই অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রতিবেশী দেশগুলো তুলনামূলকভাবে কম দামে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলেও বাংলাদেশে তা অনেক বেশি খরচে হচ্ছে। সোলার বা রিনিউয়েবল প্রকল্পে প্রকৃত উৎপাদন খরচ অনেক কম হলেও নীতিগত কাঠামোর কারণে বাজারমূল্য কয়েকগুণ বেশি রাখা হচ্ছে। এতে করে সাধারণ ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির চাপ বাড়ছে।

অধ্যাপক শামসুল আলম জ্বালানি খাতের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে বলেন, এই খাতে যদি লুন্ঠনের সুযোগ বন্ধ না করা যায়, তাহলে জ্বালানি নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব কোনোভাবেই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তার মতে, আগে অযৌক্তিক ব্যয় ও দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা বন্ধ করতে হবে, এরপরই মূল্য নির্ধারণ বা নীতি সমন্বয়ের প্রশ্ন আসতে পারে। জ্বালানি খাতকে সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবামূলক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার এবং কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। 


এএইচ/এফএ