images

অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি নেই বাজারে

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম

* বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় রফতানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর

* জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানির চাপ

* রেমিট্যান্স কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে

* জ্বালানি মূল্যের প্রভাবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চাপে রয়েছে 

* বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ অব্যাহত রয়েছে

দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিললেও খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা কাটেনি এখনো। চালের দামে কিছুটা স্বস্তি এলেও সবজি, মাছ ও মাংসের উচ্চমূল্য ভোক্তাদের স্বস্তি ফিরতে দিচ্ছে না। ফলে পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাস্তবে জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও চাপে রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এপ্রিল মাসের অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। এই হ্রাসের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার কমে আসা। মার্চ মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মার্চ মাসে চালের বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা বা দাম কমার ধারা দেখা গেছে। বোরো ধানের আগমন, সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে চালের দাম কিছুটা কমেছে। এর ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কিছুটা কমেছে এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতির হারও নিম্নমুখী হয়েছে। তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ একই সময়ে মাংসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে বড় অবদান রাখছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাংসের দাম বৃদ্ধি খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে ১৫ শতাংশের বেশি অবদান রেখেছে। পাশাপাশি মাছ ও শুকনো মাছের দামও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা ভোক্তাদের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। মৌসুমি সরবরাহ ঘাটতি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম এখনো বেশি। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের খাদ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত খাতেও মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি। আবাসন, পরিবহন, জ্বালানি ও বিভিন্ন সেবাখাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এ খাতের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে স্থিতিশীল রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের ওঠানামা এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও যদি খাদ্যবহির্ভূত খাতে চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ বাসাভাড়া, পরিবহন ও বিদ্যুতের খরচ বাড়লে তা সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে প্রভাব ফেলে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। মার্চ মাসে মজুরি কিছুটা বাড়লেও তা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ আরো বেড়ে যাচ্ছে।

এদিকে বৈদেশিক খাতেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। আমদানি ব্যয় বেশি থাকায় রিজার্ভে চাপ তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রফতানি খাতেও ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় রফতানি প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় কিছুটা শ্লথ হয়েছে। দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প এখনও শক্ত অবস্থানে থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা এ খাতে প্রভাব ফেলছে।

অন্যদিকে, জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানির চাপ আরো বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম অস্থির থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। যদিও এটি পুরো চাপ কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট নয়, তবুও অর্থনীতিতে কিছুটা ভারসাম্য আনতে সহায়তা করছে।

প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরো বাড়তে পারে। এতে দেশের আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার তদারকি জোরদার এবং উৎপাদন খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এএইচ/এফএ