images

অর্থনীতি

জ্বালানি সার্বভৌমত্ব ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়: ফাহমিদা খাতুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম

জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা ও বৈশ্বিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, জ্বালানি সার্বভৌমত্ব ছাড়া কোনোভাবেই টেকসই ও স্থিতিশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, কারণ জ্বালানি এখন আর শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সিপিডি, ড্যানিশ দূতাবাস এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত একটি গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সার্বভৌমত্ব: টেকসই ও স্থিতিস্থাপক ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এ আলোচনায় তিনি দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং রফতানি খাতের বিস্তারের ফলে জ্বালানি চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, পরিবহন ব্যবস্থা, গৃহস্থালি খাত এবং শিল্প উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কিন্তু এই চাহিদার বিপরীতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ এখনও গ্যাসনির্ভর, যা একসময় দেশীয় উৎস থেকে পূরণ হলেও বর্তমানে সেই মজুদ দ্রুত কমে আসছে। ফলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। এই নির্ভরতা শুধু অর্থনৈতিক চাপই সৃষ্টি করছে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বাজেট ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ২০২২ ও ২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব বাংলাদেশেও গভীরভাবে পড়েছে। ওই সময়ে এলএনজির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে জ্বালানি আমদানি সীমিত করতে হয়েছে, যার ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি পেয়ে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো অনিশ্চিত করে তুলছে। যেহেতু বিশ্বের বড় একটি অংশের জ্বালানি সরবরাহ নির্ভর করে নির্দিষ্ট কিছু রুট ও অঞ্চলের ওপর, তাই যেকোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর পড়ে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ে।

Fuel

নির্বাহী পরিচালক বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি শুধু শিল্প খাতকেই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেও প্রভাবিত করে। পরিবহন খরচ, খাদ্যপণ্যের দাম এবং উৎপাদন ব্যয় সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা না থাকলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। সংকটকালীন পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নীতিগতভাবে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না। ফলে একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জ্বালানিকে শুধু অর্থনৈতিক খাত হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনও খুবই সীমিত, যা মোট জ্বালানি ব্যবহারের মাত্র ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মতো। জমির সীমাবদ্ধতা, গ্রিড অবকাঠামোর দুর্বলতা, বিনিয়োগ ঘাটতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা এ খাতের বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

ড. ফাহমিদা খাতুন আরো বলেন, জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য তিনটি মূল দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, রাজনৈতিকভাবে আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি স্বীকার করে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিকভাবে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো। তৃতীয়ত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ধীরে ধীরে রূপান্তর নিশ্চিত করা। জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জন করা মানে হলো দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার ওপর আংশিক হলেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, যাতে বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব কমিয়ে আনা যায়।


এএইচ/এফএ