images

অর্থনীতি

ভর্তুকি ও ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ বাজেটের ২৮ শতাংশ!

আব্দুল হাকিম

২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম

  • ভর্তুকি-সুদ মিলিয়ে ২.৫৯ ট্রিলিয়ন টাকার ব্যয়
  • বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২.৩৫ ট্রিলিয়ন টাকা
  • ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়নে বাড়বে চাপ
  • মোট ঋণ বাড়ছে ১৭.৫ শতাংশ
  • মূল্যস্ফীতি না কমলে বাড়বে সুদের চাপ

আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ২৭ শতাংশের বেশি ব্যয় হতে যাচ্ছে ভর্তুকি, প্রণোদনা, সুদ পরিশোধ ও নগদ ঋণ খাতে। জ্বালানি দামের অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপের কারণে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা আরও ভারী হওয়ার ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে।

অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯.৩ ট্রিলিয়ন টাকা। এর মধ্যে শুধু সুদ, ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা খাতে ব্যয় দাঁড়াতে পারে ২.৫৯ ট্রিলিয়ন টাকা। যা বাজেটের প্রায় ২৭.৮৬ শতাংশ। যা আগামী বাজেটের বড় একটি অংশ দখল করবে।

কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি আমদানির ব্যয় দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ভর্তুকির হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থিতিশীল থাকলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হতে পারে। অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদহার ও ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট অব্যাহত থাকলে সরকারের সুদ পরিশোধ ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে এই চাপ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও তারা মনে করছেন।

এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নসংক্রান্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্ভাবনাও বাজেট পরিকল্পনায় চাপ সৃষ্টি করছে। বিএনপি সরকার যদি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ চালু করে, তবে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হারসংক্রান্ত সমন্বয় পরিষদের বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। ওই বৈঠকে পরবর্তী বাজেটের প্রাথমিক চিত্র ও সম্ভাব্য চাপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

বৈঠকে উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় ২.৩৫ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৩.৪ শতাংশের সমান। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতির হার ছিল ৩.৩ শতাংশ, অর্থাৎ টাকার অঙ্কে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন।

এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১.১৯ ট্রিলিয়ন টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১.১৬ ট্রিলিয়ন টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। মোট ঋণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন টাকা বা ১৭.৫ শতাংশ বেশি হতে পারে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ একাই ৮৪ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার ধীরে ধীরে বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকছে, কারণ ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্রভিত্তিক ঋণে সুদ ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি।

আরও পড়ুন

এডিপি বাস্তবায়ন হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

ব্যয় কমানোর অঙ্গীকার নিয়ে উল্টোপথে হেঁটেছে অন্তর্বর্তী সরকার!

আগামী বাজেটে সুদ পরিশোধ খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১.৪২ ট্রিলিয়ন টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ১.১৫ ট্রিলিয়ন টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন টাকা ব্যয় হতে পারে।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকলে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে অথবা ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট কাটতে দেরি হলে সুদ পরিশোধের এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে ভর্তুকি খাতও চাপে রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ৩৭০ বিলিয়ন টাকা, এলএনজি খাতে ৬৫ বিলিয়ন টাকা, সার খাতে ২৭০ বিলিয়ন টাকা এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে ৯৬ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১.১৭ ট্রিলিয়ন টাকা।

Budget2
আসছে নতুন অর্থবছরের বাজেট। ছবি: সংগৃহীত

চলতি বাজেটের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এই ব্যয় সামান্য বেশি হলেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যেটি সরাসরি ভর্তুকি চাপ বাড়াবে।

অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের মার্চ থেকে জুন সময়েই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ভর্তুকি খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন টাকার চাপ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন

২৫ হাজার প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়বৃদ্ধি, অনিয়মের শঙ্কা

৬৫ শতাংশ কাজ শেষে থমকে গেছে ‘হাওর’ শিক্ষা প্রকল্প

কৃষি, রফতানি ও পাট খাতে প্রণোদনার বরাদ্দ অপরিবর্তিত থাকলেও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রণোদনা বাড়িয়ে ৭০ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা আগের তুলনায় ৮ বিলিয়ন টাকা বেশি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদ পরিশোধের মতো ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ খুবই সীমিত। এসব ব্যয় একবার তৈরি হলে তা কমানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়।

অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন, ভর্তুকি খাতে আরও লক্ষ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেসব খাতে সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠী উপকৃত হয় না, সেসব ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ভর্তুকি কমানো উচিত। অযাচিত ভর্তুকি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা আরও বেড়ে যাবে।

ড. কে মুজেরি বলেন, সুদ পরিশোধের মতো ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কম। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। ভর্তুকি ব্যয় যৌক্তিক করতে হবে এবং তা সঠিকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। যেসব খাত সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপকারে আসে না, সেসব ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ভর্তুকি কমাতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা আরও বাড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।

এএইচ/জেবি