মহিউদ্দিন রাব্বানি
২০ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩০ পিএম
রাজধানীর খুচরা বাজারে আবারও বেড়েছে ডিমের দাম। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খামার পর্যায়ে উৎপাদন কমে যাওয়া, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহে টান পড়ায় ডিমের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, হাতিরপুল ও যাত্রাবাড়ী বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২০-১২৫ টাকা এবং সাদা ডিম ১১০-১১৫ টাকায়। আকারভেদে কোথাও কোথাও দাম উঠেছে ১৩০ টাকা পর্যন্ত। হাঁসের ডিম বিক্রি হচ্ছে ডজনপ্রতি প্রায় ১৮০ টাকায়।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনপ্রতি প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এই হিসেবে এক মাস ধরলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৩০ টাকা। একমাস আগে প্রতি ডজন ডিম ৯০ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানায়, পাইকারি বাজারেই দাম বাড়ছে, ফলে খুচরা পর্যায়ে এর প্রভাব পড়ছে।
কারওয়ান বাজারপর ডিম বিক্রেতা সামিউল বলেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়লেই আমাদেরও বাড়াতে হয়। গত কয়েক দিনের মধ্যেই ডজনে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। সামনে আরও বাড়তে পারে।
আরেক বিক্রেতা জানান, খামার থেকে আগের মতো নিয়মিত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবহন খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, গরম মৌসুমে খামারে উৎপাদন কিছুটা কমে যায়। এ সময় খাদ্যসহ উৎপাদন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খরচ বাড়লে বাজারে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
জ্বালানির প্রভাব নিয়ে ভিন্নমত
বাজারে ডিমের দাম বাড়ার পেছনে অনেক বিক্রেতা পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকে দায়ী করলেও জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে ডিজেলের কোনো সংকট নেই। সরবরাহ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে কয়েক হাজার মেট্রিক টন ডিজেল দেশে এসেছে এবং আরও আমদানির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ফলে জ্বালানি সংকটের কারণে ডিমের দাম বেড়েছে—এ দাবি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ভিন্নমত রয়েছে।
তবে সম্প্রতি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে হু-হু করে। ফলে ডিমের দাম আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
সরবরাহে চাপের ইঙ্গিত
খামারি ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি খামারিদের একটি বড় অংশ লোকসানের কারণে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন বা খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদের মতে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনে বাজারে ডিমের সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে।
ক্রেতাদের খাদ্যতালিকায় প্রভাব
ডিম সাধারণ মানুষের সবচেয়ে সহজলভ্য প্রোটিনের অন্যতম উৎস হওয়ায় এর দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ক্রেতা রায়হান বলেন, ডিম তো প্রতিদিনের খাবারের একটা অংশ। কিন্তু এখন প্রায় সবকিছুর সঙ্গে ডিমের দামও বাড়ছে। সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
আরেকজন ক্রেতা বলেন, আগে সপ্তাহে কয়েক ডজন ডিম কিনতাম। এখন কমিয়ে দিতে হচ্ছে।
অল্প সময়েই বড় দামের ব্যবধান
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রোজার আগে যেখানে ডজনপ্রতি ডিম প্রায় ১০০ টাকার আশপাশে ছিল, সেখানে এখন তা ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে এই বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহে অনিয়ম এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—এই তিনটি কারণ একসঙ্গে কাজ করায় ডিমের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
সামনে আরও চাপ বাড়ার আশঙ্কা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, প্রান্তিক খামারিদের সহায়তা, সরবরাহ শৃঙ্খলা সচল রাখা এবং বাজারে কার্যকর নজরদারি জোরদার না করলে সামনে ডিমের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রোটিনের উৎসের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তা না হলে এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার ওপর পড়তে পারে।
উৎপাদন কমছে, খামার ছাড়ছেন অনেকেই
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, বর্তমানে পোলট্রি খাত কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং প্রান্তিক খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পোল্ট্রি খাত এখন কর্পোরেট মাফিয়াদের হাতে চলে গেছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি ডিম উৎপাদনে এখন প্রায় ৩–৪ টাকা লোকসান হচ্ছে। উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ২৯ পয়সা। সারাদেশে প্রায় ৭০ হাজার খামারি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। অনেকেই খামার ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন।
তার মতে, ফিডসহ অন্যান্য উপকরণের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বাজার তদারকির অভাব এবং কর্পোরেট সিন্ডিকেটের চাপও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তিনি আরও বলেন, একদিকে ডিমের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদন কমছে। সামগ্রিকভাবে পোলট্রি খাত কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
এমআর/এআরএম