মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৪ এএম
- বিদেশি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলার
- ২০০৭ সালে ঋণের পরিমাণ ছিল ২০.৬৫ বিলিয়ন ডলার
- মাথাপিছু বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৯,৪৬৩ টাকা
- ২০২৪ সালে আ.লীগ রেখে যায় ১০৪ বিলিয়ন ডলার
- অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৩ বিলিয়নে
- বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২টি বাজেটের সমান
ধারাবাহিকভাবে প্রতিনিয়তই লাগামহীন বাড়ছে দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রেখে যাওয়া ২০.৬৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ হু-হু করে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার (১১ হাজার ৩৫১ কোটি ডলার), যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে মাথাপিছু বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৯,৪৬৩ টাকা। যা বর্তমানে দেশের মোট রিজার্ভের তিন গুনেরও বেশি। বিদেশি ঋণের এই অর্থ বাংলাদেশের প্রায় দুইটি বাজেটের সমান।
এর আগে সেপ্টেম্বরে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার (১১ হাজার ২২১ কোটি ডলার) এবং জুন শেষে ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার (১১ হাজার ৩৫৮ কোটি ডলার)। ফলে জুনের তুলনায় ঋণ কিছুটা কমলেও সেপ্টেম্বরের তুলনায় বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৮২ শতাংশ ছিল সরকারি খাতের, বাকিটা বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাদের। সেই অনুযায়ী, সরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার, আর বেসরকারি খাতের ঋণ ছিল ২০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ঋণের মধ্যে ৮৭ দশমিক ৬২ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি এবং ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ স্বল্পমেয়াদি। সরকারি ঋণের মধ্যে ৮০ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার সরাসরি সরকারের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে, আর ১২ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি ব্যাংক ও অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে।
বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিন প্রান্তিকে এ খাতের ঋণ কমেছে। তবে শেষ প্রান্তিকে অর্থাৎ অক্টোবর–ডিসেম্বর শেষে তা আবার ২০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এ খাতের মোট স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ১০ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ঋণ ৬ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের স্থিতি ৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ডলার–সংকট কাটাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হয়। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে লাগামহীনভাবে ঋণ নেওয়া হয়। এসব প্রকল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে না। এ জন্য ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে হবে সরকারকে। প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের অর্থ দিয়ে বিদেশি ঋণ শোধ করতে হবে সরকার ও বেসরকারি খাতকে।
আরও পড়ুন:
সঞ্চয়পত্র কী? কেন করবেন, কীভাবে করবেন
তথ্য বলছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে। ২০১২ সালে বেড়ে ২৭ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন, ২০১৮ সালে ৫৭ দশমিক ২ বিলিয়ন, ২০২২ সালে ৯৬ দশমিক ১১ বিলিয়ন এবং ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়নে দাঁড়ায়। পরবর্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফ এর হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ ম্যানুয়াল অনুযায়ী রিজার্ভ ২৯ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে অবস্থান করছে। সে হিসেবে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে গ্রাস রিজার্ভের তিন গুণেরও বেশি।
এদিকে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাস জুলাই-জানুয়ারিতে যত বিদেশি ঋণ এসেছে, এর চেয়ে বেশি শোধ করতে হয়েছে। এই সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে ২৬৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার। অন্যদিকে একই সময়ে সরকারকে বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশের পাওনা বাবদ ২৬৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। কয়েক বছর ধরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ রাজস্ব আদায় না হওয়ায় বিদেশি ঋণ বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, আমাদের রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণে আমরা ঋণ নির্ভর হয়ে পড়েছি। ফলে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, অর্থ সংকট দূর করতে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। এজন্য ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে হবে। উন্নয়ন করতে হবে ব্যবসার পরিবেশ। আমদানি-রপ্তানি বাড়াতে হবে। ব্যাংক খাতকে গতিশীল করতে হবে। তাহলে রাজস্ব বাড়বে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা খাতে ভারসাম্য শক্তিশালী হবে।
২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর হওয়ার জেরে দেশে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করে। এতে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ঘাটতি দেখা দেয়। তখন ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকায় ওঠে। এতে দেশের মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। সংকট সামাল দিতে আওয়ামী লীগ সরকার তখন আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি ঋণ বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এরপরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন থামানো যায়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রিজার্ভের পতন থামাতে সক্ষম হয়েছিল। ডলারের বিনিময় হারেও এসেছে স্থিতিশীলতা।
টিএই/এএস