নিজস্ব প্রতিবেদক
০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে ৩০ দশমিক ৩১ শতাংশ; যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য বাড়লেও সামগ্রিকভাবে বাস্তবায়ন গতি এখনও নিম্নমুখী রয়েছে।
বুধবার (১ এপ্রিল) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে মোট বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ব্যয় করতে পেরেছে ৬৩ হাজার ৩২৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩০.৩১ শতাংশ। অর্থবছরের দুই-তৃতীয়াংশ সময় পার হলেও বাস্তবায়নের হার ৩০ শতাংশের ঘরে আটকে থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আইএমইডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২৯.৮৭ শতাংশ। যদিও চলতি বছরে সামান্য উন্নতি হয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিবেচনায় বাস্তবায়ন হার কমতির দিকেই রয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়ন ছিল ৩৩.৬৫ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৪.৭৪ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ৩৮.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রথম আট মাসের বাস্তবায়ন হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মোট ১ হাজার ৩৫৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৪৫টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ১২১টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প, ৬৬টি নিজস্ব অর্থায়নে, ১৮টি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং ৯টি উন্নয়ন সহায়তা থোক প্রকল্প রয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও বরাদ্দ অনুযায়ী ব্যয় না হওয়ায় সামগ্রিক বাস্তবায়ন হার কমে আছে।
তহবিলভিত্তিক ব্যয়ের চিত্রে দেখা যায়, সরকারি তহবিল (জিওবি) থেকে বরাদ্দের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হলেও ব্যয়ের হার তুলনামূলক কম। মোট বরাদ্দের ৬১.২৬ শতাংশ বা প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা জিওবি থেকে এলেও এ খাত থেকে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩৪ হাজার ২১৯ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের ২৬.৭৩ শতাংশ।
অন্যদিকে বৈদেশিক সহায়তা বা প্রকল্প ঋণ খাতে বরাদ্দ ৭২ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৪ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা ৩৪.৬০ শতাংশ। আর সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে বরাদ্দ ৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা, যা সর্বোচ্চ ৪৬.৯৩ শতাংশ।
এদিকে মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে এককভাবে ১২ হাজার ৭৭১ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ৬.১১ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই মাসে ব্যয় ছিল ৭ হাজার ৬৭৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বা ৩.৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে ব্যয়ের গতি বাড়লেও সামগ্রিক বাস্তবায়নে তা বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাস্তবায়ন চিত্রে বড় ধরনের বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ৭০.৭৪ শতাংশ বাস্তবায়ন করে শীর্ষে রয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ, যা সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাত, সেখানে বাস্তবায়ন হয়েছে ৪১.৬২ শতাংশ। এছাড়া খাদ্য মন্ত্রণালয় ৭২.২০ শতাংশ ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ৪২.৪০ শতাংশ এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ২২.৪৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে।
অন্যদিকে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সামাজিক খাতগুলোর অগ্রগতি হতাশাজনক। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বাস্তবায়ন হার মাত্র ২৯.১৩ শতাংশ। সেতু বিভাগে ২২.৪৯ শতাংশ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ২০.৭৯ শতাংশ।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অগ্রগতি ২১.০৮ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের বাস্তবায়ন মাত্র ১২.৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন হার ২০.৭৬ শতাংশ। সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে জননিরাপত্তা বিভাগ, যেখানে মাত্র ৩.৭৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাস্তবায়নের হার ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকা মানে বাকি চার মাসে প্রায় ৭০ শতাংশ বরাদ্দ ব্যয় করতে হবে। এতে শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে ব্যয় করার প্রবণতা বাড়বে, যা প্রকল্পের গুণগত মান ও অর্থের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ধীরগতির বাস্তবায়ন সামগ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এএইচ/এআরএম