images

অর্থনীতি

কতটা হচ্ছে তেলের কার্যকর ব্যবস্থাপনা?

ঢাকা মেইল ডেস্ক

৩০ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

ইরান যুদ্ধের প্রভাবের মধ্যে বাংলাদেশে তৈরি জ্বালানি সংকটকে পুঁজি করে সরকার এখন তেলের মজুত ও পাচার ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মজুতদারদের ধরতে এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও প্রশ্ন উঠছে-এতে কি বাস্তব চাহিদা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে, নাকি এটি শুধু চাক্ষুষ উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকবে?

সরকার বলছে, দেশে অকটেন ও পেট্রল নিয়ে ‘কৃত্রিম সমস্যা’ তৈরি হয়েছে, যদিও এসব জ্বালানির চাহিদা মাত্র ৬ শতাংশের কিছু বেশি। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে যে, যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ফুয়েল কার্ড চালু কিংবা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা বা আহ্বান জানালেও সার্বিকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা যথাযথ হচ্ছে কি-না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার একদিকে সাশ্রয়ী হবার কথা বলছে, কিন্তু অন্যদিকে দোকানপাট বাজারঘাট রাত পর্যন্ত চালু রাখা হচ্ছে- আবার জ্বালানি সাশ্রয়ে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল কমিয়ে আনার কোনো চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে না।

তাদের মতে, সরকার তেল সংগ্রহে যথাযথ উদ্যোগ নিলেও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সফল হচ্ছে না এবং গুছিয়ে পদক্ষেপ নিতে পারছেনা বলেই তাদের কাছে মনে হচ্ছে।

যদিও জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদী সংকটের আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে সাশ্রয়ী কিংবা কৃচ্ছতা সাধনের জন্য 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' কিংবা 'অনলাইনে ক্লাস'সহ আরও কিছু প্রস্তাবনা তৈরির কাজ এখন চলছে।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘সরকার সিরিয়াসলি এগুলো বিবেচনা করছে। এগুলো নিয়ে বিভিন্ন বিভাগ কাজ করছে। আমরা আপাতত সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য বলছি।’

অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা কতটা হচ্ছে

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সরকারকে সবচেয়ে বেশি লড়াই করতে হচ্ছে তেলের মজুতদারি ও পাচার ঠেকানোর জন্য। সোমবার মজুতদারদের ধরতে সহায়তার জন্য লাখ লাখ টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬২ শতাংশ পূরণ করা হয় আমদানির মাধ্যমে, আর এই আমদানির বেশির ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে জ্বালানি তেল আমদানি সংকটে পড়তে পারে বিবেচনায় সরকার একাধিক বিকল্প উৎস থেকে তেল ও এলএনজি আনার উদ্যোগ নেয়।

প্রতিবেশী ভারত থেকেও পাইপলাইনে করে চারটা চালানে ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এসেছে বাংলাদেশে। রাশিয়া থেকে ৬ লাখ টন তেল আনার জন্য চিঠি দিয়ে আমেরিকার উত্তরের অপেক্ষায় আছে সরকার।

অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলা থেকে এলএনজি আনার পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬০ হাজার মেট্রিকটনের দুটো কার্গো শিগগিরই বাংলাদেশে এসে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশের সাথে সরকার আরও তেল ও গ্যাসের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমদানির ক্ষেত্রে সরকার যতটা উদ্যোগ নিয়েছে, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় ততটা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না কেন।

বিশেষ করে বিশ্বের কিছু দেশ অফিস আওয়ার কমানো, অনলাইন অফিস বাড়ানো, জোর বিজোড় সংখ্যার গাড়ি আলাদা করে তেল সরবরাহ করার মতো পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশে তেমনটি দেখা যায় না।

বরং পেট্রল বা অকটেনের জন্য দেশজুড়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেলেও মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি ‘গ্যারেজে রেখে গণপরিবহনে’ চলার ক্ষেত্রে জনসাধারণকে উৎসাহিত এবং প্রয়োজনে বাধ্য করার মতো কোনো পদক্ষেপ সরকার নেয়নি বলে বলছেন জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক অধ্যাপক শামসুল আলম।

আবার সারাদেশের বাজারঘাট থেকে শুরু করে দোকানপাট শপিং মল পর্যন্ত সন্ধ্যার পরেও কয়েক ঘণ্টা ধরে চালু থাকতে দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গেই বাজারসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেই। বরং মোটর বাইকের তেলের ট্যাংক আলাদা করে নিয়ে তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে ফিলিং স্টেশন থেকে এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে দেশের বহু জায়গায়। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে মোটরসাইকেল চলাচলে আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপের চিন্তাও এখন গুরুত্ব পায়নি।

‘সার কারখানার গ্যাস অন্য জায়গায় দিতে হচ্ছে। সামনে কী হয় আমরা জানি না। সেখানে সরকারের উচিত অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় আরও নজর দেওয়া। কৃচ্ছতা সাধন করতেই হবে। দেখতে হবে সবাইকে নিয়ে কিভাবে সংকটের সময়টার উত্তরণ ঘটানো যায়। এজন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি।’ বলেন অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তাফিজুর রহমান।

যা বলছে সরকার

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম মনির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘মোটরসাইকেলকে বিবেচনায় নিয়েই জেলা প্রশাসকরা ফুয়েল কার্ড চালু করছেন এবং একটা অ্যাপস তৈরি করা হচ্ছে যাতে কিউ আর কোড থাকবে। এক সপ্তাহে একবার তেল নিয়ে আবার আর কোথাও গেলে যেন টের পাওয়া যায়।’

তিনি জানান, জ্বালানি চাহিদার মাত্র ৬ শতাংশ হলো অকটেন এবং সেখানেই এই ‘কৃত্রিম সমস্যা’ তৈরি হয়েছে। ‘মজুতদারির একটা অংশ, প্যানিক বায়িং মানসিকতার কারণে সংকট বেশি চোখে পড়ে। সাপ্লাই চেন বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।’

এছাড়া প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, সরকারের বিভিন্ন বিভাগ এখন কিছু ‘সাশ্রয়ী পদক্ষেপ’ নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করছে। এটি চূড়ান্ত হলে অফিস সময়সূচিতে পরিবর্তন, সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো কিংবা ওয়ার্ক ফ্রম হোম নীতি সাময়িক সময়ের জন্য চালু করা হতে পারে।

আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বন্ধ না করে করোনার সময়কালের মতে অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়টিও আলোচনায় আছে।

মন্ত্রিসভার পরবর্তী বৈঠকে এসব বিষয় আলোচনায় আসতে পারে বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এর আগে সরকার বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে নির্দেশনা জারি করেছিল। এতে করিডোর, সিঁড়ি, ওয়াশরুমসহ সাধারণ স্থানে যতটা সম্ভব আলোর ব্যবহার কমাতে এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। অফিস সময় শেষ হওয়ার পর সব ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওই নির্দেশনায়।

অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, সরকার বিভিন্ন সূত্র থেকে জ্বালানি আনার চেষ্টা করছে এবং রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করছে।

‘সাপ্লাই ঠিক রাখতে এগুলো ভালো পদক্ষেপ। ভারত থেকে পাইপলাইন ব্যবহার করে আরও আনা যায় কি-না সরকার তা দেখতে পারে। আবার ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল থেকে আনা বিদ্যুতের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। এর পাশাপাশি সংকটকালকে বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করতে হবে।’ বলেন তিনি।

যদিও অধ্যাপক শামসুল আলম বলছেন সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ বা কমানো সম্ভব হয় কিন্তু সাপ্লাই চেইনেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ শতভাগ হয়নি।

‘সরকার আসলে গুছিয়ে ভাবছে না। মজুত থেকে সরবরাহ- সব ধাপে সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুরো হয়নি বলেই কালোবাজারির উত্থান হয়েছে। তেল কালোবাজারে গিয়ে কারা লাভবান হচ্ছে সেটা পরিষ্কার। চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনাও স্পষ্ট নয়। রাস্তায় গাড়ি কমানো, গণপরিবহন বাড়ানো—জনগণের মধ্যে বার্তা শক্তভাবেই দেওয়া যেতো। কিন্তু তা হয়নি সেসব হয়নি।’ বলেন তিনি। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

এমআর