নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ মার্চ ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
দীর্ঘদিনের মন্দা ও আস্থাহীনতার পর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। টানা বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রবণতা কাটিয়ে আবারও বাজারে ফিরতে শুরু করেছেন বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা। পাশাপাশি সক্রিয় হচ্ছেন স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও, যা বাজারে নতুন করে আশার সঞ্চার করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ মাসের প্রথম ১৭ দিনে (১২ কার্যদিবস) বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব বেড়েছে ৫৫টি। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে চারটির বেশি নতুন হিসাব যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে তিন হাজার ১৬টি, যা প্রতিদিন গড়ে ২৫০টির বেশি।
বিও হিসাব হলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য একজন বিনিয়োগকারীর নিজস্ব হিসাব নম্বর, যার মাধ্যমে ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। এই হিসাব ছাড়া শেয়ার কেনাবেচা সম্ভব নয়। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এসব হিসাবের তথ্য সংরক্ষণ করে।
সিডিবিএলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ২৫২টি। ফেব্রুয়ারি শেষে যা ছিল ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১১১টি। অর্থাৎ, মার্চ মাসেই নতুন করে যুক্ত হয়েছে তিন হাজার ১৪১টি হিসাব। এতে প্রতিদিন গড়ে ২৬০টির বেশি হিসাব বেড়েছে।
বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বর্তমানে বিও হিসাব রয়েছে ৪৩ হাজার ১৯৭টি, যা ফেব্রুয়ারি শেষে ছিল ৪৩ হাজার ১৪২টি। যদিও সংখ্যাটি সামান্য বেড়েছে, তবুও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে সরে যাচ্ছিলেন।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই প্রবণতা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২টি, যা কমে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ৪৩ হাজার ১০১টিতে নেমে আসে। অর্থাৎ, এই সময়ে ১২ হাজারের বেশি হিসাব কমে যায়। এখন সেই ধারার পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যদিও আগের অবস্থানের তুলনায় এখনও বিদেশি বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কম, তবুও সাম্প্রতিক বৃদ্ধি বাজারে আস্থার আভাস দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে। বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৩১টি, যা ফেব্রুয়ারি শেষে ছিল ১৫ লাখ ৮৯ হাজার ১৫টি। আর ২০২৫ সালের শেষে ছিল ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৩টি। অর্থাৎ, চলতি বছরেই দেশি বিনিয়োগকারীর হিসাব বেড়েছে ১৩ হাজারের বেশি।
তবে সামগ্রিক চিত্রে দেখা যায়, শেয়ারবাজার এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ২০২৪ সালের শুরুতে যেখানে মোট বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ২৫২টিতে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বাজার থেকে সরে গেছেন ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারী।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি বাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত। তবে এই প্রবণতা টেকসই করতে হলে বাজারে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে, বিনিয়োগকারীদের গঠনে পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব রয়েছে ১২ লাখ ৪৪ হাজার ২২৬টি, যা গত বছরের শেষে ছিল ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৩টি। অন্যদিকে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯১ হাজার ২টিতে।
কোম্পানি হিসাবেও কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে। বর্তমানে কোম্পানির নামে বিও হিসাব রয়েছে ১৮ হাজার ২৪টি, যা ২০২৫ সালের শেষে ছিল ১৭ হাজার ৮০৩টি।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ মন্দার পর শেয়ারবাজারে ধীরে ধীরে আস্থার পরিবেশ ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুনরাগমন এবং স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই বাজারকে আবারও চাঙ্গা করতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা।
এমআর/ক.ম