images

অর্থনীতি

নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়কে নকল প্রসাধনীর দাপট, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

আব্দুল কাইয়ুম

১১ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম

  • চকবাজার, পুরান ঢাকা, কেরানীগঞ্জ ও সাভার নকল প্রসাধনী তৈরির রেড জোন
  • নকল প্রসাধনী ব্যবহারে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ক্যানসার হতে পারে
  • জরিমানার পাশাপাশি সম্পদ জব্দসহ কঠোর শাস্তির দাবি ব্যবসায়ীদের

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমে উঠেছে প্রসাধনীর বাজার। নতুন পোশাকের সঙ্গে সাজগোজের প্রস্তুতিতে কসমেটিকস দোকানগুলোতে বেড়েছে ক্রেতাদের ভিড়। এই বাড়তি চাহিদার সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অসাধু একটি চক্র। নামিদামি বিদেশি ব্র্যান্ডের মোড়কে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বিপুল নকল ও নিম্নমানের প্রসাধনী। এসব পণ্য ব্যবহারে ত্বকে অ্যালার্জি, জ্বালাপোড়া ও চুলকানির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, নকল কসমেটিকস তৈরির সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে কেবল নামমাত্র কয়েক হাজার টাকা জরিমানা করেই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ এসব নকল প্রসাধনী মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

তাদের দাবি, শুধু সামান্য জরিমানা করায় এসব চক্রের সদস্যরা আবারও একই ব্যবসায় ফিরে আসে। তাই আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি তাদের সম্পদ জব্দসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

রাজধানীর বেশ কয়েকটি মার্কেট, শপিং মল ও ফুটপাতের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, নামিদামি বিদেশি ব্র্যান্ডের লিপস্টিক, ফাউন্ডেশন, ফেসক্রিম, পারফিউম ও স্কিন কেয়ার পণ্য হুবহু নকল করে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্যাকেট, লোগো ও ডিজাইন এতটাই মিল রয়েছে যে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল-নকল পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

দোকানগুলোতে বিশ্বমানের ব্র্যান্ড গার্নিয়ার, লরেল, রেভলন, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, লাক্স লোশন, মাস্ক লোশন, অ্যাকুয়া মেরিন লোশন, পেনটিন, নিভিয়া লোশন, ফেড আউট ক্রিম, ডাভ সাবান, ইমপেরিয়াল সাবান, সুগন্ধির মধ্যে হুগো, ফেরারি, পয়জন, রয়েল, হ্যাভক ও কোবরা, অলিভ অয়েল, কিওকারপিন, আমলা, আফটার সেভ লোশন, জনসন, ভ্যাসলিন হেয়ার টনিক, জিলেট ফোম, প্যানটিন প্রো-ভি ও হারবাল এসেনশিয়াল লোশনের নামে ভেজাল প্রসাধনী বিক্রি হচ্ছে বেশি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, রাজধানীর চকবাজার, পুরান ঢাকা, কেরানীগঞ্জ ও সাভার নকল প্রসাধনীর হটস্পট হিসেবে গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় ভাড়া করা বাসা-বাড়িতে নকল প্রসাধনী তৈরির কারখানা স্থাপন করেছে অসাধু চক্র। তৈরি পণ্য আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মোড়ক লাগিয়ে বাজারে ছড়িয়ে দেয় হচ্ছে।

অভিযানে যা মিলছে

১০ মার্চ (মঙ্গলবার) বিকেলে রাজধানীর মহাখালী এসকেএস টাওয়ারে জেএস ট্রেডিংসহ দুটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে সতর্ক করে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিদফতর।

আমদানি করা প্রসাধনী পণ্যের গায়ে কোনো ধরনের লেবেল না থাকায় তাদের জরিমানা করা হয়। এ সময় দুটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের পণ্যের গায়ে বিস্তারিত তথ্যসহ লেভেল লাগানোর জন্য সময় বেঁধে দেন।

40

গত ৩ মার্চ দুপুরে আলোচিত ব্রান্ড প্রোমোটর ফারজানা ইসলামের শোরুম থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্রান্ডের নাম ও লোগো ব্যবহার করা বিপুল নকল কসমেটিকস উদ্ধার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব-২)। নকল কসমেটিক্স বিক্রির অভিযোগে ‘মেক ইট আপ বাই ফারজানা ইসলামের মোহাম্মদপুরে শোরুমে অভিযান চালিয়ে এসব নকল কসমেটিক্স জব্দ করে শোরুমটি সিলগালা করা হয়।

অভিযান শেষে র‍্যাব-২ এর অধিনায়ক খালেদুল হক বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা শোরুমটিতে অভিযান চালাই। প্রাথমিক যাচাইয়ে দেখেছি, জনপ্রিয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো ব্যবহার করে নিম্নমানের পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছিল। এসব পণ্যের কোনো বৈধ কাগজপত্রও দেখাতে পারেননি প্রতিষ্ঠানটি। তিনি বলেন, এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শো-রুম সিলগালা করা হয়েছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‎এছাড়া গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পুরান ঢাকার বংশালের পেয়ালাওয়ালা মসজিদ সংলগ্ন ৫৮ নম্বর বাসার তৃতীয় তলায় নামবিহীন নকল কসমেটিকস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে বিপুল নকল প্রসাধনী জব্দ করেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে জনসন, ইমামি, সানসিল্ক, ডাভ, হেড অ্যান্ড সোল্ডারস, প্যানটিনসহ বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির নকল প্রসাধনী। এ সময় নামিদামি ব্রান্ডের পণ্যের খালি বোতল, লেবেল, প্রস্তুতকৃত মালামাল এবং উৎপাদনে ব্যবহৃত ক্ষতিকর কেমিক্যালসহ নিম্নমানের কাঁচামাল জব্দ করা হয়।

‎‎যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

‎চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএন হুদা বলেন, ভেজাল প্রসাধনীগুলো মারাত্মক ক্ষতিকারক উপাদানে তৈরি হয়। যা ব্যবহারে ত্বক পুড়ে যায়, চামড়া ড্যামেজ হতে থাকে। এরপর ত্বকে বিভিন্ন ধরনের এলার্জি হয়। এসব রাসায়নিক উপাদানগুলো এলার্জি, মাইগ্রেইনস এবং হাঁপানি সৃষ্টি করতে পারে। এসব ব্যবহারে শুধু ক্যানসার হতে পারে তা নয়, এসব থেকে স্নায়বিক দুর্বলতাও দেখা দিয়ে থাকে।

‎‎তিনি আরও বলেন, বাজারে সবচেয়ে বেশি চলছে রং ফর্সাকারী ক্রিম। এর মাধ্যমে বেশি প্রতারিত হচ্ছে মানুষ। বিশ্বে এখনো কোনো রং ফর্সাকারী ক্রিম আবিষ্কার হয়নি। তবে মুখে যদি কারও দাগ পড়ে বা এলার্জির সমস্যা হয় তখন সেসব রোগের কিছু চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে, নকল প্রসাধনী মানবদেহের জন্য অনেক ক্ষতিকর।

‎‎ব্যবসায়ীদের দাবি

‎ঝিগাতলা রাইফেলস স্কয়ারের ব্যবসায়ী তহুর আহমেদ বলেন, ঈদের সময় প্রসাধনীর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সেই সুযোগে কিছু অসাধু আমদানিকারক ও সরবরাহকারী কম দামে নকল পণ্য বাজারে সরবরাহ করে। লাভের আশায় কিছু দোকানদারও এসব পণ্য বিক্রি করছে। এসব নকর পণ্য বিক্রি করে যেমন আমাদের ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষতি ডেকে আনছে, তেমনি ভোক্তাদের শরীরের ক্ষতি হচ্ছে। আমরা চাই, সরকার এসব অসাধু চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। তাহলে বাজারে নকল কোন প্রসাধনী কেউ বিক্রি করার সাহস পাবে না।

‎‎নিউমার্কেটের প্রসাধানী ব্যবসায়ী আলতাফ আলী বলেন, ‘আমি গত ২৫ বছর নিউমার্কেটে প্রসাধনীর ব্যবসা করছি। প্রসাধনী কেনার ক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। নতুন কোন কোম্পানি এলে তার থেকে আকর্ষণীয় জিনিস কম দামে নিলেই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এখন সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে বিদেশি ব্রান্ডগুলো দেশের বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে বসে নকল হচ্ছে। এসব নকল পণ্যে বাজার সয়লাভ। কাস্টমার না বুঝে কম দামে পেয়ে এসব পণ্য কিনতে গিয়ে ত্বকের ক্ষতি করে ফেলছে। আমরা চাই, অসাধু চক্রের সদস্যদের পাওয়া মাত্রই সরকার আর্থিকভাবে বিশাল অঙ্কের টাকা জরিমানা করে তাকে নিঃস্ব করে কঠোর শাস্তির আওতায় নিয়ে আসুক। তাহলে অসাধু চক্রকে ঠেকানো যাবে।’

‎‎ভোক্তা অধিকারের হুঁশিয়ারি

ভোক্তা অধিকারের উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে পোশাকের পাশাপাশি কসমেটিকস পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে। নকল  কসমেটিকস নিয়ে আমাদের কাছে ভোক্তারা অনেক অভিযোগ করেন। আমরা এসব অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিভিন্ন মার্কেটের কসমেটিকসের দোকানগুলোতে অভিযান চালিয়ে অনেক নকল কসমেটিকস পণ্য জব্দ করি। নকল কসমেটিকস পণ্য কোথায় আছে, কারা বিক্রি করছে আমরা এসব তথ্য পেয়েছি। ক্রমান্বয়ে আমরা সকল প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালাবো।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমদানিকারকরা কোথা থেকে পণ্য আমদানি করেছে, কোন কোম্পানি এবং তাদের ঠিকানা কোথায় এসব তথ্য প্রতিটি পণ্যের গায়ে লাগাতে হবে। কাস্টমাররা যেন বিস্তারিত দেখে পণ্য যাচাই করে কিনতে পারে। যদি পণ্যের গায়ে এসব তথ্য না থাকে অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

একেএস/এমআর