আব্দুল হাকিম
১১ মার্চ ২০২৬, ১১:১৬ এএম
- রমজানের শেষ সপ্তাহে কুরিয়ার সেবায় বাড়ে চাপ
- সময় বাঁচাতে অনলাইনে ঝুঁকছেন চাকরিজীবীরা
- জনপ্রিয়তায় শীর্ষে পণ্য পেয়ে মূল্য পরিশোধ পদ্ধতি
- নারীদের থ্রি-পিস, শাড়ি ও কুর্তির চাহিদা সবচেয়ে বেশি
- হ্যান্ডপেইন্ট ও ব্লক প্রিন্ট পোশাক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে
রমজান এলেই দেশের বাজারগুলোতে বাড়ে কেনাকাটার ব্যস্ততা। ইফতারসামগ্রী, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আর সবচেয়ে বেশি যে খাতটি প্রাণ ফিরে পায় তা হলো কাপড়ের বাজার। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নতুন পোশাক কেনা বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে কেনাকাটার ধরন। আগের মতো শুধু বিপণিবিতান, মার্কেট বা ফুটপাতনির্ভর কেনাকাটায় সীমাবদ্ধ নেই মানুষ। এখন স্মার্টফোন হাতে ঘরে বসেই সারাদেশের দোকান ঘুরে দেখা যাচ্ছে, পছন্দের কাপড় বেছে নেওয়া যাচ্ছে, অর্ডার দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই তা পৌঁছে যাচ্ছে বাড়ির দরজায়।
রাজধানীর নিউমার্কেট, বসুন্ধরা সিটি বা গাউছিয়া মার্কেট এখনো জমজমাট। কিন্তু সেই ভিড়ের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে আরেকটি ভার্চ্যুয়াল ভিড়। ইফতারের পর রাত গভীর পর্যন্ত চলছে নতুন সংগ্রহ প্রদর্শন, বার্তার মাধ্যমে অর্ডার গ্রহণ এবং মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের নির্দেশনা। অনেক পরিবার এখন ইফতারের পর একসঙ্গে বসে অনলাইনে বাসায় বসেই ঈদের কেনাকাটা সারছেন।
দেশের বড় অনলাইন বেচাকেনা প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি ‘দারাজ বাংলাদেশ’ রমজান উপলক্ষে বিশেষ ছাড় কর্মসূচি চালু করেছে। ঈদকে সামনে রেখে পুরুষদের পাঞ্জাবি, ফতুয়া, নারীদের থ্রি-পিস, শাড়ি, গাউন, শিশুদের পোশাকসহ নানা ধরনের কাপড় এক জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে। একইভাবে দেশীয় খ্যাতনামা ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘আড়ং, ইয়োলো এবং সেইলর’ তাদের নতুন ঈদ সংগ্রহ অনলাইনে উন্মুক্ত করেছে। শোরুমে ক্রেতার ভিড় থাকলেও অনলাইন অর্ডারের পরিমাণও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
চাকরিজীবীদের কাছে অনলাইন কেনাকাটা যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। রাজধানীর মিরপুরে বসবাসকারী নওশিন তাবাসসুম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তিনি জানান, রমজানে অফিসের কাজ শেষ করতেই দিন পার হয়ে যায়। ইফতারের পর ক্লান্ত শরীরে ভিড়ের মধ্যে গিয়ে কেনাকাটা করার শক্তি থাকে না। তাই এবার পরিবারের সবার ঈদের পোশাক অনলাইনে কিনেছেন। তিনি বলেন, ঘরে বসে দাম তুলনা করা যায়, সময় বাঁচে, ভিড় এড়ানো যায়। পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধের সুযোগ থাকায় নিশ্চিন্ত থাকি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফারহানা ইসলাম বলেন, তার মেয়ের বয়স চার বছর। ঈদকে সামনে রেখে বেশ কয়েকটি অনলাইন পেজ ঘুরে দেখার পর নিউ ড্যাজল বেবি ফ্যাশনের নতুন স্টার সেট তার নজরে আসে। তিনি জানান, ছবিতে পোশাকের নকশা, রঙের সমন্বয় এবং কাপড়ের ধরন তার ভালো লেগেছে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে আরাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই তিনি পোশাকটি অর্ডার করেছেন। ফারহানা ইসলাম বলেন, বাচ্চারা ঈদের দিন অনেকক্ষণ বাইরে থাকে, আত্মীয়দের বাসায় যায়। তাই পোশাক আরামদায়ক না হলে তারা অস্বস্তিতে পড়ে। এখানে যে কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে তা নরম বলে জানানো হয়েছে, সেটিই আমাকে কিনতে উৎসাহ দিয়েছে।
মিরপুরের বাসিন্দা রেজাউল করিম জানান, তিনি চাকরিজীবী হওয়ায় প্রতিদিন অফিসের ব্যস্ততার কারণে বাজারে যাওয়ার সময় পান না। রমজানে ইফতারের পর বাইরে গিয়ে ভিড় সামলানোও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এবার ছেলের জন্য ঈদের পোশাক অনলাইনেই অর্ডার করেছেন। তিনি বলেন, মার্কেটে গেলে ভিড়, যানজট আর সময়ের ঝামেলা মেটানো কষ্টকর হয়ে যায়। তবে অনলাইনে ছবি দেখে পছন্দ করা যায়, আবার পণ্য হাতে পাওয়ার পর টাকা দেওয়ার সুযোগ থাকায় ঝুঁকিও কম। তাই এই সুবিধাটাই আমাকে অনলাইনে কিনতে উৎসাহ দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, রমজানের প্রথম সপ্তাহ থেকে অনলাইনে পোশাক বিক্রি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। পনেরো রোজার পর অর্ডারের চাপ দ্বিগুণ হয়ে যায়। নারীদের পোশাকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে পাকিস্তানি ধাঁচের থ্রি-পিস, লন কাপড়, কটন শাড়ি, নকশিকাঁথা শাড়ি, হাতের কাজ করা পাঞ্জাবি এবং শিশুদের রঙিন পোশাক বেশি বিক্রি হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন নকশা ও বৈচিত্র্যময় রঙের প্রতি আগ্রহ বেশি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা জানান, সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে কাপড় দেখানোর ফলে ক্রেতার আস্থা বাড়ছে। কাপড়ের গুণগত মান, সেলাই, রঙের তারতম্য কাছ থেকে দেখানো যায়। অনেকেই পণ্য বদল বা ফেরতের সুযোগ দিচ্ছেন, যা ক্রেতাদের আশ্বস্ত করছে। কুরিয়ার সেবার উন্নতির কারণে রাজধানীর বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও দ্রুত পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে ছোট উদ্যোক্তারাও সারাদেশে ব্যবসা বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশে এক লাখ ১৬ হাজার ৯৭৮টি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে পণ্য ও সেবা বিক্রি করছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক পেজ ও দোকান মিলিয়ে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি পেজভিত্তিক ব্যবসা সক্রিয় রয়েছে, যাকে অনেকেই এফ-কমার্স নামে অভিহিত করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লেনদেনের ক্ষেত্রে এখনো হাতে পণ্য পেয়ে মূল্য পরিশোধ পদ্ধতিই সবচেয়ে জনপ্রিয়। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্রেতা এভাবে মূল্য পরিশোধ করেন। তবে মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিকাশ এবং নগদের মাধ্যমে অগ্রিম মূল্য দিলে অনেক বিক্রেতা অতিরিক্ত ছাড় দিচ্ছেন। এতে বিক্রেতার ঝুঁকি কমছে, আবার ক্রেতাও কিছু সুবিধা পাচ্ছেন।
আস্থা শপের স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে জানান, ভিড় ও দরদামের ঝামেলা এড়াতে অনেকেই অনলাইনে ঝুঁকছেন। প্রতিযোগিতা বেশি হওয়ায় দামও তুলনামূলক কম রাখা হয়। ফলে ক্রেতারা আকৃষ্ট হচ্ছেন। তিনি বলেন, রমজানের মাঝামাঝি থেকে অর্ডার অনেক বেড়ে যায়। অধিকাংশ ক্রেতাই আগেভাগে পোশাক কিনে ফেলছেন।
শিশু পোশাকের প্রতিষ্ঠান নিউ ড্যাজল বেবি ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী তানভির আহমেদ জানিয়েছেন, আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ছোট শিশুদের জন্য বিশেষ পোশাক সংগ্রহ বাজারে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, দুই থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের কথা মাথায় রেখে নতুন নকশার স্টার সেট তৈরি করা হয়েছে, যা আরামদায়ক কাপড় ও আধুনিক ডিজাইনে প্রস্তুত। ঈদের দিনে ছোট সোনামণিদের স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দকে গুরুত্ব দিয়েই এ সংগ্রহ সাজানো হয়েছে।
তানভির আহমেদ জানান, প্রতিটি পোশাকের মান নিশ্চিত করতে প্রিমিয়াম গুণগত মানের কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে। শিশুদের সংবেদনশীল ত্বকের কথা বিবেচনায় রেখে আরামদায়ক ফেব্রিক নির্বাচন করা হয়েছে, যাতে দীর্ঘ সময় পরেও তারা স্বস্তিতে থাকতে পারে। সারাদেশে নগদে মূল্য পরিশোধ সুবিধাসহ দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। অর্ডার করতে আগ্রহীরা সরাসরি বার্তা পাঠানো বা নির্ধারিত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন।
অন্যদিকে অনলাইন বেচাকেনা ডট কম নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আহমেদ আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, চাকরিজীবীরা বোনাস পাওয়ার পর কেনাকাটা বাড়িয়ে দেন। তবে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন। বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে মান ও সেবায় ভিন্নতা আনতে হয়।
অনলাইন কেনাকাটার সুবিধা যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। কখনো ছবির সঙ্গে বাস্তব পণ্যের অমিল, নিম্নমানের কাপড়, সময়মতো সরবরাহ না পাওয়া বা অর্ডার বাতিলের অভিযোগ শোনা যায়। বিশেষ করে রমজানের শেষ সপ্তাহে কুরিয়ার সেবায় চাপ বেড়ে যায়। ফলে অনেকেই রোজার মাঝামাঝি সময়েই অর্ডার সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রেতাদের সচেতন হতে হবে। বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্ম বেছে নেওয়া, আগের ক্রেতাদের মতামত দেখা এবং পণ্য ফেরতের নীতিমালা জেনে নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সরকারের উচিত অনলাইন বাণিজ্য খাতের ওপর নজরদারি জোরদার করা এবং ক্রেতাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করা।
দেশের ই-কমার্স বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশের অনলাইন বাজারের আকার ছিল ৫৬ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৬৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বর্তমানে এ বাজার প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের ই-কমার্স বাজার এক লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি। তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হওয়ায় তারা অনলাইনে কেনাকাটায় আগ্রহী। দাম তুলনা, নতুন নকশা দেখা এবং দ্রুত অর্ডার দেওয়ার সুবিধা তাদের আকৃষ্ট করছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও অনলাইন বাজারের বড় গ্রাহক। বিদেশে বসে তারা পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদের পোশাক অর্ডার করছেন। আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন বিক্রেতারা। এতে দূরত্ব কমছে, প্রবাসী পরিবারের সঙ্গে সংযোগও দৃঢ় হচ্ছে।
এএইচ/জেবি