মহিউদ্দিন রাব্বানি
১১ মার্চ ২০২৬, ০৯:২৫ এএম
ঢাকার অন্যতম বৃহৎ পোশাকের পাইকারি বাজার ছিল বঙ্গবাজার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা এখানে ভিড় করতেন সাশ্রয়ী দামে পোশাক কিনতে। বিশেষ করে ঈদ এলেই এই বাজারে জমে উঠত উৎসবের আমেজ। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলত কেনাবেচা। দোকানিদের মুখে থাকত ব্যস্ততা, আর ক্রেতাদের ভিড়ে হাঁটা পর্যন্ত কঠিন হয়ে যেত।
কিন্তু ২০২৩ সালের রমজান মাসের এক সকালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তেই বদলে দেয় সেই চেনা দৃশ্য। কয়েক ঘণ্টার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় হাজার হাজার দোকান। ধ্বংস হয়ে যায় বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা ব্যবসা, পুঁজি আর স্বপ্ন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রোজা বা ঈদ এলেই সেই ভয়াবহ দিনের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আঁতকে উঠে হৃদয়। ব্যবসা ঠিকমতো চলছে না, কীভাবে ঈদ উদযাপন করব, ভাবতেই অগণিত দুশ্চিন্তা জাগে।

ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা। নতুন মার্কেট নির্মাণের কাজ চললেও তা শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। ফলে অনেক ব্যবসায়ী এখনো মার্কেটের আশপাশের ফুটপাতে বা অস্থায়ী দোকানে বসে কোনোরকমে জীবিকা চালাচ্ছেন।
দুই দশকের ব্যবসা, আজ ফুটপাতে বসে জীবন
ষাটোর্ধ্ব ব্যবসায়ী আওলাদ হোসেন প্রায় দুই দশক ধরে বঙ্গবাজারে ব্যবসা করেছেন। ছোট একটি দোকান দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস ছিল এই ব্যবসাই। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের সেই দিনে সবকিছু মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। দোকান, পণ্য, পুঁজি—সবকিছু আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
এখন তিনি বঙ্গবাজারের পাশের ফুটপাতে বসে প্যান্ট বিক্রি করেন। প্রতিদিন সকালে এসে ছোট্ট একটি জায়গায় কাপড় সাজিয়ে বসেন। দিন শেষে যা বিক্রি হয়, তাই দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলে।
হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, বিশ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করেছি। আগুনে সব শেষ হয়ে গেল। এখন ফুটপাতে বসে কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছি। তিন বছর হয়ে গেল, কিন্তু মার্কেটের কাজ এখনো শেষ হয়নি। কবে শেষ হবে তাও কেউ বলতে পারে না।
এই ব্যবসায়ী বলেন, বয়সের কারণে নতুন কোনো পেশায় যাওয়ার সুযোগও নেই। আমার বয়স হয়ে গেছে। অন্য কোনো কাজ শিখিনি। ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা করি। অনেক তরুণ ব্যবসায়ী বিদেশ চলে গেছে। কিন্তু আমার আর সেই সুযোগ নেই। মনে হয় না জীবনে আবার দোকানটা পাবো।

ঈদের মৌসুমেও নেই আগের সেই ব্যস্ততা
বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে ঈদের মৌসুম ছিল বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের বেচাকেনার ওপরই অনেকটা নির্ভর করত তাদের সারা বছরের আয়।
আগে রমজান এলেই বাজারজুড়ে দেখা যেত ভিন্ন এক দৃশ্য। রাতভর ট্রাক থেকে নামত পোশাকের বস্তা, দোকানিরা ব্যস্ত থাকতেন নতুন পণ্য সাজাতে। ক্রেতাদের ভিড়ে বাজারের প্রতিটি গলি পরিণত হতো জনস্রোতে।
কিন্তু আগুনের পর সেই দৃশ্য আর ফিরে আসেনি। এখন ফুটপাতে বসে ব্যবসা করতে হচ্ছে অনেককে।
আওলাদ হোসেন বলেন, ঈদের সময়ই আমাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু এখন ফুটপাতে বসে তেমন ক্রেতা আসে না। যারা আসে তারাও অনেক সময় দরদাম করে খুব কম দামে কিনতে চায়। তবু আশা করছি রোজার শেষের দিকে হয়তো কিছুটা বিক্রি বাড়বে।
লাখ টাকার ব্যবসা হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বঙ্গবাজারের আরেক ব্যবসায়ী তসলিম হোসেন জানান, আগুনে তার লাখ লাখ টাকার পণ্য পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, আমার দোকানে ঈদের জন্য অনেক পণ্য তোলা ছিল। সবকিছু আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। তখন মনে হয়েছিল জীবনে আর উঠে দাঁড়াতে পারবো না।

তসলিম হোসেনের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন অনিশ্চয়তা। মার্কেটের কাজ খুব ধীরগতিতে চলছে। কবে শেষ হবে কেউ বলতে পারে না। আমরা আবার সেই জায়গায় দোকান পাবো কি না তাও নিশ্চিত না। এই অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটানো খুব কঠিন।
পাইকারি ব্যবসা থেকে ফুটপাতের সংগ্রাম
আলামিন নামের আরেক ব্যবসায়ী জানান, আগুনের আগে তারা পাইকারি ও খুচরা দুই ধরনের ব্যবসাই করতেন। বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা এসে তাদের কাছ থেকে পোশাক কিনতেন। কিন্তু আগুনের পর পরিস্থিতি পুরো বদলে গেছে।
'একসময় আমরা বড় পরিসরে ব্যবসা করতাম। এখন ফুটপাতে বসে ব্যবসা করতে হচ্ছে। এতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়নি, সামাজিকভাবেও অনেক সমস্যায় পড়েছি,' বলেন আলামিন।
তিনি জানান, অনেক সময় ফুটপাতে বসে ব্যবসা করার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপের মুখেও পড়তে হয়। আবার বৃষ্টি বা খারাপ আবহাওয়ায় ব্যবসা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
'আগে দোকান ছিল, নিরাপত্তা ছিল। এখন খোলা আকাশের নিচে ব্যবসা করতে হয়। কখন বৃষ্টি হবে, কখন উচ্ছেদ অভিযান হবে—সবসময় একটা ভয় কাজ করে,' বলেন তিনি।

ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ড
২০২৩ সালের রমজানের এক সকালে বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সকাল ৬টা ১০ মিনিটে পোশাকের একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে জানা যায়।
দ্রুত আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক দোকান আগুনে পুড়তে থাকে। বাজারজুড়ে তৈরি হয় আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা।
আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৪৮টি ইউনিট কাজ করে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনীর সহায়তাকারী দল এবং একটি হেলিকপ্টার আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেয়।
দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে দুপুর ১২টা ৩৬ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এই অগ্নিকাণ্ডে বঙ্গবাজারের প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার দোকান পুড়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
ঈদের আগে বিক্রির জন্য বিপুল পরিমাণ পোশাক দোকানে তোলা হয়েছিল। ফলে আগুনে পুড়ে যায় কোটি কোটি টাকার পণ্য। অনেক ব্যবসায়ীর দোকানে রাখা নগদ অর্থও আগুনে নষ্ট হয়ে যায়।

দোকান ফিরে পাওয়া নিয়েও শঙ্কা
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মনে এখন সবচেয়ে বড় ভয় হলো তারা আবার নিজেদের দোকানের জায়গা ফিরে পাবেন কি না। ব্যবসায়ীরা জানান, অতীতে বিভিন্ন মার্কেটে আগুন লাগার পর অনেক সময় প্রকৃত দোকানিরা নিজেদের জায়গা ফিরে পাননি। অন্য কেউ সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে এমন ঘটনাও ঘটেছে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই অনেক ব্যবসায়ী এখনো উদ্বেগের মধ্যে আছেন।
এক ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো, নতুন মার্কেট হলে আমরা কি সত্যিই আমাদের পুরোনো দোকান পাবো? যদি না পাই, তাহলে তো আমাদের সব শেষ।
এদিকে মার্কেটের কাজ কতটুকু শেষ হলো এ বিষয়ে জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করার পরও যোগাযোগ করা যায়নি৷
ছাইয়ের ভেতরেও বেঁচে থাকা আশা সব হারিয়েও অনেক ব্যবসায়ী এখনো বঙ্গবাজার ছাড়েননি। তারা বিশ্বাস করেন, একদিন হয়ত আবার নতুন করে শুরু করার সুযোগ আসবে।
কেউ ফুটপাতে বসে, কেউ অস্থায়ী দোকানে বসে প্রতিদিন অপেক্ষা করছেন সেই দিনের জন্য, যেদিন আবার নিজেদের দোকানের শাটার তুলতে পারবেন। তবে বাস্তবতা হলো, তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিন এখনো অনেক দূরের মনে হচ্ছে।
ঈদ সামনে এলেও আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই বঙ্গবাজারে। পোড়া মার্কেটের ধ্বংসস্তূপ আর ফুটপাতে বসে থাকা ব্যবসায়ীদের চোখে এখনো ভাসে সেই আগুনের স্মৃতি। তারপরও তারা অপেক্ষা করছেন—একদিন হয়তো ছাই থেকে আবার নতুন করে জেগে উঠবে তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের বাজার।
এমআর/জেবি