images

অর্থনীতি

বিগত সরকারের চুক্তিগুলোতে বিচ্যুতি আছে কি না খতিয়ে দেখা উচিত: দেবপ্রিয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে জনতুষ্টিমূলক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। নতুন সরকারকে অবশ্যই আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কৃচ্ছতা ও সংযম দেখাতে হবে।’

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘আপনি যদি কৃচ্ছতা না করেন, সংযম না দেখান, তাহলে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আর্থিক শৃঙ্খলা ছাড়া সামনের সময়টা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’

নিরঙ্কুশ জয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে তারা শক্ত অবস্থানে আছে। তবে সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’

তিনি সরকারের জন্য একটি ট্র্যানজিশন টিম বা উত্তরণকালীন দল গঠনের প্রস্তাব দেন। তার ভাষায়, এক সরকার থেকে আরেক সরকারে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় আগের সরকারের রেখে যাওয়া দায়-দেনা, প্রতিশ্রুতি ও চ্যালেঞ্জগুলো স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

‘এ কাজটি একটি বিশেষ দল করতে পারে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা ব্রিফিং ডকুমেন্ট প্রস্তুত করা যেতে পারে, যেখানে আগের সরকারের সিদ্ধান্ত, প্রকল্প ও আর্থিক দায়বদ্ধতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ থাকবে’, বলেন দেবপ্রিয়।

আগের সরকারের কার্যক্রমের ময়নাতদন্তের আহ্বান

তিনি পূর্বের সরকারের কার্যক্রমের ময়নাতদন্ত করার আহ্বান জানান। বিশেষ করে শেষ সময়ে সম্পাদিত বিভিন্ন ক্রয় ও বৈদেশিক চুক্তি পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেন।

এই অর্থনীতিবিদের মতে, ওই চুক্তিতে কোনো অনিয়ম বা নীতিগত বিচ্যুতি হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত।

‘বিগত সরকার দায়িত্ব ছাড়ার আগে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করেছে। সেগুলো শুধু একটি দেশের সঙ্গে নয়, বিভিন্ন খাতে হয়েছে। নতুন সরকারের জানা দরকার এসব চুক্তির দায়-দায়িত্ব কীভাবে বর্তাবে’, যোগ করেন তিনি।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকার যেহেতু এ প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের কথা বলছে, তাই সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তি ও দায়বদ্ধতাগুলোও নতুন করে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।’

ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, ‘ট্র্যানজিশন টিম যদি এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে সুস্পষ্ট সুপারিশ দিতে পারে, তাহলে সরকার অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক কাজ এগিয়ে নিতে সুবিধা পাবে।’

তিনি নতুন সরকারের প্রতি দায়িত্বশীল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং নীতিগত সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান।

প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমানো উচিত

সভায় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপর দেওয়া প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমানো উচিত। কারণ, যে প্রণোদনা রেমিট্যান্সের ওপর দেওয়া হচ্ছে, তা আমাদের রাজস্বের ওপরে চাপ সৃষ্টি করছে।’

তিনি বলেন, ‘যদি ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে এবং তার ওপর আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তাহলে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। এই অর্থনৈতিক চাপটা অবশ্যই আমাদের হিসাব করতে হবে।’

এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘এক্ষেত্রে প্রণোদনা কমানোর পাশাপাশি টাকার মূল্য বাজারভিত্তিক করা যেতে পারে। প্রবাসীরা তখন প্রতি ডলারের বিপরীতে দেশে বেশি টাকা পাবেন। ফলে টাকা কিছুটা অবমূল্যায়িত (ডেপ্রিসিয়েশন) হলে রেমিট্যান্সের প্রবাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।’

টাকার মান ধীরে ধীরে অবমূল্যায়ন করা উচিত

মূল প্রবন্ধে সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘বর্তমানে অর্থনীতি একটি বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকার সেই সংকটকালে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এখানে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এক, সমষ্টিগত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। দুই, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি একটি নির্ভরযোগ্য অবস্থানে নেই। তিন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে অনেক সীমাবদ্ধ।’

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য কয়েকটি নীতি সুপারিশ করেছে সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, টাকার মান ধীরে ধীরে অবমূল্যায়ন করা উচিত। রেমিট্যান্স ও রপ্তানির জন্য প্রণোদনা কমিয়ে আনার সময় হয়েছে। আর চলতি বছরের বাজেট বাস্তবসম্মতভাবে সংশোধন করা প্রয়োজন, যাতে আগামীর অর্থবছরের জন্য সঠিক প্রস্তুতি নেওয়া যায়।

এএইচ/এএম