নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা হারালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বড় ধরনের ধাক্কায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, এতদিন ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা কাজে লাগিয়ে যে রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর সেই সুবিধা না থাকলে পোশাক খাত কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।
বৃহস্পতিবার (১৯ জানুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে নাগরিক উদ্যোগের সহযোগিতায় ‘দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন।
সভায় সঞ্চালনা করেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ এলডিসি গ্রাজুয়েশন ওয়াচের বরকত উল্লাহ মারুফ। আলোচনায় বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা প্রমুখ।
বরকত উল্লাহ মারুফ বলেন, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী বাংলাদেশ এখনো স্বল্পোন্নত দেশ হলেও আগামী নভেম্বর মাসে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের তালিকায় যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, অবকাঠামো খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, বাণিজ্য ঘাটতি ও মাথাপিছু ঋণের সূচকে দেশের দুর্বলতা রয়ে গেছে।
বরকত উল্লাহ বলেন, দেশের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২১ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বার্ষিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। রফতানির তুলনায় আমদানি বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণ বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু মেগা প্রকল্পে উচ্চ ব্যয় দেশের ঋণ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালের হিসাবে বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানি আয় প্রায় ৫৮ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার ৮১ শতাংশই তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ও বিশেষ সুবিধা পাওয়ায় এই খাত দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
বরকত উল্লাহ বলেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর এসব সুবিধা উঠে গেলে চীনসহ অন্যান্য বড় রফতানিকারক দেশের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে হবে বাংলাদেশকে। কোটা সুবিধা না থাকলে তৈরি পোশাকের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শ্রমমূল্য কম থাকা বাংলাদেশের একটি সুবিধা হলেও উৎপাদন দক্ষতা, প্রযুক্তি ও সরবরাহ সক্ষমতায় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবধান রয়ে গেছে।
সভায় জানানো হয়, এলডিসি সুবিধা হারানোর আশঙ্কায় বাংলাদেশ জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পৃথক দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তবে এসব চুক্তিতে লাভের তুলনায় ক্ষতির ঝুঁকি বেশি বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
সভায় আরও জানানো হয়, চুক্তির একটি ধারায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানিতে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করবে বলে উল্লেখ আছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ভাষা ব্যবহার করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার তুলনামূলকভাবে নমনীয়। কোন ধরনের পোশাক এবং কত পরিমাণ আমদানি করা হবে, তা পরবর্তীতে নির্ধারণ করা হবে বলে উল্লেখ থাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে রফতা নির সুযোগ নির্ভর করবে বাংলাদেশ কত পরিমাণ তুলা ও কৃত্রিম তন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করবে তার ওপর। কিন্তু ওই কাঁচামালের দাম প্রতিযোগিতামূলক হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই বলেও মত দেওয়া হয়।
বক্তারা বলেন, নির্বাচনের আগে দ্রুততার সঙ্গে কেন এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদন করা হলো এবং কেন সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি। তাদের মতে, কৃষক, শ্রমিক, নারী, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও গবেষকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পৃক্ত না করে নেওয়া সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বক্তারা আরও বলেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন না করা পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধা ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।
পাশাপাশি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে সংশোধন বা বাতিলের পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বক্তারা। ভবিষ্যতে এ ধরনের চুক্তি করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করারও দাবি তোলেন বক্তারা।
এএইচ/এফএ