নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম
রমজানকে সামনে রেখে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যের নিরাপদতা এবং ঝুঁকি মোকাবেলায় ১৫ দফা নাগরিক দাবি তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করেছে পরিবেশবাদী ও নাগরিক সংগঠনগুলো।
আজ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হল রুমে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে যৌথভাবে অংশ নেয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বিসেফ ফাউন্ডেশন, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও শিসউক।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির। সূচনা বক্তব্য দেন শিসউক’র নির্বাহী পরিচালক শাকিউল মিল্লাত মোর্শেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিকশিত বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আতাউর রহমান মিটন।
শাকিউল মিল্লাত মোর্শেদ বলেন, নতুন সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য স্বল্পমূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করা। তিনি বাজার সিন্ডিকেট ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, যে দেশে স্ট্রিট ফুড নিরাপদ, সে দেশ উন্নয়নের দিক থেকে এগিয়ে থাকে।
মূল প্রবন্ধে আতাউর রহমান মিটন বলেন, খাদ্য নিরাপদতা ও পুষ্টিমান নিশ্চিত না হলে খাদ্য নিরাপত্তার ঘোষণা অর্থহীন। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ অনুযায়ী খাদ্য ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান তিনি। বিশেষ করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ-এর দায়িত্ব ও ভূমিকা জোরালোভাবে তুলে ধরেন। গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে মাসব্যাপী জনসচেতনতা এবং দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, রমজানে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা এবং নিরাপদ খাদ্য সুলভে পৌঁছে দেওয়া সরকারের প্রতি নাগরিকদের প্রধান প্রত্যাশা। তিনি ভেজাল ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
ক্যাব’র প্রেসিডেন্ট এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান বলেন, ভেজাল খাদ্য ও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নীতি-নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি কৃষিজমিতে ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের স্বার্থে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও সিন্ডিকেট ভাঙাকে তিনি সরকারের জন্য ‘এসিড টেস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিসেফ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ও সিইও রেজাউল করিম সিদ্দিক বলেন, রমজান থেকেই নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে ভালো কাজের সূচনা হোক। একই সঙ্গে জনসচেতনতা ও বাজার তদারকি বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। ক্যাব’র সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, আমদানিকৃত খাদ্যদ্রব্য যথাযথভাবে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং অসাধু ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে উপস্থাপিত ১৫ দফা দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রতিটি বাজারে “নিরাপদ কৃষকের বাজার” প্রতিষ্ঠা
২. খাদ্যপণ্যে মজুদ ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি
৩. নিরাপদ খাদ্য উৎপাদক ও বিপণনকারীদের প্রণোদনা
৪. নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী দায়বদ্ধতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা
৫. অনিরাপদ পানি, বরফ ও অননুমোদিত রং-সংযোজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
৬. রাসায়নিক দিয়ে পাকানো ফল, বাসি-পচা ও খোলা খাবার বিক্রি বন্ধ
৭. কেন্দ্রীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি কার্যকর করা এবং বাজারভিত্তিক নাগরিক তদারকি কমিটি গঠন
৮. “নিরাপদ খাদ্য” সিল প্রবর্তন
৯. ভ্রাম্যমাণ আদালত জোরদার ও প্রমাণভিত্তিক শাস্তি
পণ্যের মেয়াদ ও পুষ্টিমান দৃশ্যমান প্রদর্শন
১০. ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধ ও নিরাপদ বিকল্পে রূপান্তর
১১. খাদ্য নিরাপদতা গবেষণায় বিশেষ তহবিল
১২. একক জানালা ভিত্তিক ডিজিটাল খাদ্য ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং পোর্টাল চালু
সংবাদ সম্মেলনে বাপা’র সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান, কোষাধ্যক্ষ মো. আমিনুর রসুল, সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাসসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বলেন, রমজানে বাজার স্থিতিশীল রাখা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার আস্থা ফেরাতে সরকারের সমন্বিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
এমআর/ক.ম