নিজস্ব প্রতিবেদক
০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম
আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজি ও অনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধে কর্তৃপক্ষকে কঠোর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। তাদের মতে, দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও সরবরাহ চেইনে অদৃশ্য বাধা তৈরি হলে বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, মজুদ, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে দি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হয়।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে এফবিসিসিআই’র মতিঝিল কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান।
সভায় খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ের বিভিন্ন বাজার সমিতির নেতারা জানান, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ অধিকাংশ নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ বর্তমানে দেশে রয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে এবারের রমজানে এসব পণ্যের মূল্য বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে পরিবহন, আড়ত ও পাইকারি পর্যায়ে চাঁদাবাজি রোধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে সাধারণ ভোক্তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য না কিনে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
এ সময় রমজান উপলক্ষ্যে বাজার তদারকির নামে খুচরা ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এফবিসিসিআই’র মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা। তাদের বক্তব্য, প্রান্তিক খুচরা ব্যবসায়ীদের পক্ষে বাজার অস্থিতিশীল করা সম্ভব নয়। বরং আমদানিকারক ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আবুল হাশেম বলেন, চিনিকল মালিকরা সঠিকভাবে যোগান দিলে বাজারে চিনির কোনো সংকট হবে না। সরকারি উদ্যোগে চিনি আমদানি বাড়ানো গেলে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতামূলক দামে চিনি বিক্রি করতে পারবেন।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মাওলা বলেন, শুধু খুচরা পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখা যাবে না। বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও আমদানিকারক পর্যায়েও সরকারের কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার তসলিম শাহরিয়ার জানান, রমজানের অতিরিক্ত চাহিদা মোকাবিলায় দেশে ভোজ্যতেল ও চিনির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তবে নির্বাচনকেন্দ্রিক ছুটির কারণে বন্দরে পণ্য খালাস, পরিবহন ও কাস্টমস কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হতে পারে। এর বাইরে সরবরাহ চেইনে বড় কোনো সংকট নেই।
রমজানে কাঁচাপণ্যের বাজার নিয়েও ইতিবাচক ইঙ্গিত দেন কাঁচাবাজার বণিক সমিতির নেতারা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে লেবু ছাড়া প্রায় সব ধরনের শাকসবজির দাম স্বাভাবিক রয়েছে এবং রমজানেও তা ভোক্তাদের নাগালের মধ্যেই থাকবে।
সভায় শুরুতে এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান নিত্যপণ্যের চাহিদা, মজুদ ও বাজার পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এবারের রোজা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক দিনের মধ্যেই রমজান শুরু হবে। এ কারণে সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
তবে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কার কথাও তুলে ধরেন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া। তিনি বলেন, এ বছর জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে, যা রমজানে আরও প্রকট হতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকার গঠনের ‘ট্রানজিশন পিরিয়ডে’ বাজার তদারকি কিছুটা দুর্বল হওয়ার সুযোগ নিতে পারে অসাধু মহল।
সমাপনী বক্তব্যে এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর প্রতি বাজারে সরবরাহ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বাজার তদারকির নামে যেন ব্যবসায়ীদের অহেতুক হয়রানি করা না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান তিনি। সভায় উত্থাপিত বিষয়গুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে এফবিসিসিআই’র পক্ষ থেকে তুলে ধরা হবে বলেও জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় এফবিসিসিআই’র সাবেক পরিচালক মো. গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী (খোকন), খন্দকার রুহুল আমিন, মো. আবুল হাশেম, মহাসচিব মো. আলমগীরসহ বিভিন্ন বণিক সমিতির নেতা, সরকারি সংস্থা ও শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এমআর/এফএ