নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির কাছে ইজারা চুক্তি প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে টানা ছয় দিন কর্মবিরতির পর কর্মমুখর হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর। এতে কর্মবিরতির চাপ কাটিয়ে রেকর্ড সংখ্যক জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। যা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নজির বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে এ তথ্য জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
ওমর ফারুক বলেন, কর্মবিরতির পর শুক্রবার সকালে এক জোয়ারে ২৬ জাহাজের মুভমেন্ট সম্পন্ন করে রেকর্ড স্থাপন করে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি।
তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে বন্দরের জেটিতে আটকা পড়া ১০টি জাহাজ বন্দর ত্যাগ করেছে এবং বহির্নোঙরে জটে থাকা ১৬টি জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করে বিভিন্ন জেটিতে বার্থিং নিয়েছে। একইভাবে শনিবারও সমসংখ্যক জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। যা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নজির স্থাপন হলো।
বন্দরের পরিচালক বলেন, এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরে এক জোয়ারে এত জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়নি। স্বাভাবিক সময়ে বন্দরে গড়ে ৮ থেকে ১০টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়। ৫টি জাহাজ জেটি ত্যাগ করলে ৫টি জাহাজ ভিড়ে। কখনো কখনো এ সংখ্যা দুয়েকটি এদিক-ওদিক হয়। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্ক সংকেত বাড়লে বন্দর থেকে সব জাহাজ বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময় সব জেটি খালি করে বন্দর থেকে সর্বোচ্চ ১৫-১৬টি জাহাজ বের করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জাহাজগুলোকে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু একই দিনের একই জোয়ারে জেটি থেকে ১০টি জাহাজকে বাইরে পাঠিয়ে বহির্নোঙর থেকে ১৬টি জাহাজকে জেটিতে নিয়ে আসার কোনো রেকর্ড নেই। এটি বন্দরের ইতিহাসে এক জোয়ারে সর্বোচ্চ জাহাজের মুভমেন্ট।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগে ঠিক কবে এক জোয়ারে এত জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে, সে তথ্য নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে একই দিনে মাত্র সোয়া তিন ঘণ্টার জোয়ারের মধ্যে ২৬টি জাহাজের ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড মুভমেন্ট প্রথম।
বন্দর সূত্র জানায়, শুক্রবার সকালের জোয়ারে জেটি থেকে ১০টি জাহাজকে বহির্নোঙরে পাঠানো হয়। এসব জাহাজ বহির্নোঙর হয়ে বিশ্বের নানা গন্তব্যে চলে যায়। জেটি থেকে সব জাহাজ বেরিয়ে যাওয়ার পর বেলা ১১টা ৩ মিনিটে এমটি সোয়ান প্যাসিফিক নামের গ্যাস বোঝাই জাহাজটি বন্দর চ্যানেল ধরে সিইউএফএল জেটিতে বার্থিং নেয়।
এরপর একের পর এক জাহাজ আসতে থাকে বন্দরের জেটিতে। সর্বশেষ দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে জোয়ার শেষ হওয়ার আগে এমভি আমওয়াজ নামের জাহাজটি জেটির পথে যাত্রা করে। সব মিলিয়ে শুক্রবার সকালের জোয়ারে বন্দরে সব জেটিতে জাহাজ বার্থিং সম্পন্ন হয়েছে। একইভাবে সমসংখ্যক জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে শনিবারও।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে কেবলমাত্র সকালের জোয়ারে জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়। নাইট নেভিগেশন না থাকায় রাতের জোয়ারে বন্দরে কোনো জাহাজ আসা-যাওয়া করে না। শুক্রবার জাহাজগুলো জেটিতে ভেরার পরপর প্রতিটি জাহাজে কাজ শুরু হয়।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, কর্মবিরতির কারণে সৃষ্ট জট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের পাশাপাশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ও ডেলিভারি কার্যক্রমেও গতি ফিরেছে। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে মোট ৩৬ হাজার ৭০৮ টিইইউএস কন্টেইনার ছিল।
এর মধ্যে ফুল কন্টেইনার লোড (এফসিএল) রয়েছে ২৯ হাজার ৬৫১ টিইইউএস, ডিপোতে ১ হাজার ৩৪০ টিইইউএস, এলসিএল ১ হাজার ৩৮ টিইইউএস, আইসিডিমুখী ১ হাজার ৬৭৮ টিইইউএস, আইসিটিতে যাবে ১০৫ টিইইউএস, খালি কন্টেনার (এমটি) ২ হাজার ৭৮ টিইইউএস এবং রফতানি কন্টেনার রয়েছে ৮১৮ টিইইউএস।
এর মধ্যে শুক্রবার ২ হাজার ২৪৭ টিইইউএস কন্টেনার ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে। শনিবারের জন্য ২ হাজার ৮২৬ টিইইউএস ডেলিভারি নির্ধারিত রয়েছে। বন্দরের মোট ধারণক্ষমতা ৫৯ হাজার টিইইউএস হওয়ায় বর্তমানে কন্টেইনার অবস্থানকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্দরের কর্মকর্তারা বলেন, কর্মবিরতির চাপ কাটিয়ে স্বাভাবিক গতিতে ফিরছে চট্টগ্রাম বন্দর। কর্মবিরতির কারণে যে জট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে বন্দর সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে। তবে এর মধ্যে শ্রমিকরা ফের কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে। যা উদ্বেগজনক।
ফের কর্মবিরতির ডাকে উদ্বেগ জানিয়েছেন আমদানি-রফতানিকারক ও শিপিং সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশের আমদানি-রফতানি খাত সংকটে রয়েছে। কর্মবিরতির নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক করা না গেলে এই সংকট তীব্র হবে।
ফের লাগাতার কর্মবিরতির ডাক দিলেন শ্রমিকরা
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে প্রত্যাহারসহ তিন দফা দাবিতে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন।
তিনি বলেন, বর্তমান চেয়ারম্যানই চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান সংকটের কারণ। তাকে অবিলম্বে চেয়ারম্যান পদ থেকে প্রত্যাহার করতে হবে।
সংগ্রাম পরিষদের অন্য দাবিগুলো হলো আগের আন্দোলনে যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত ও পদাবনতি করা হয়েছে, সেসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল করে সবাইকে নিজ নিজ পদে পুনর্বহাল করতে হবে। পাশাপাশি আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, মার্চেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ক ইয়াসিন রেজা রাজুসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
এর আগে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ তিন দফায় ৬ দিন কর্মবিরতি পালন করে। এতে আমদানি পণ্য ডেলিভারি, কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং জেটিতে জাহাজ আনা-নেওয়া বন্ধ হয়ে বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়।
গত বৃহস্পতিবার নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করে আশ্বাস দিলে সাময়িকভাবে কর্মবিরতি স্থগিত করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে বলে দাবি করেন আন্দোলনকারী শ্রমিক সংগঠনের (স্কপ) নেতারা।
নেতারা বলেন, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে বন্দরে আন্দোলনকারী ১৫ জন শ্রমিকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের সম্পদ তদন্তের আবেদন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। স্কপের মতে এটি নৌ পরিবহন উপদেষ্টার নির্দেশেই করা হয়েছে।
স্কপ এ ধরনের পদক্ষেপকে অনৈতিক ও গর্হিত আখ্যা দিয়ে জানায়, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা কিংবা সম্পদ তদন্তের হুমকিতে শ্রমিকরা ভীত নন। বরং এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নৌ উপদেষ্টা, বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বন্দর চেয়ারম্যানের সম্পদের হিসাব নেওয়াই অধিক জরুরি বলে মন্তব্য করেন তারা।
নেতারা বলেন, এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দমনে যেকোনো হয়রানিমূলক পদক্ষেপ প্রতিহত করতে স্কপ প্রস্তুত রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ যা করছে তা নিতান্ত আগুন নিয়ে খেলা করছে। তাদের দাবি বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় ফের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দেওয়া হলো।
আন্দোলনকারীদের সম্পদের তদন্ত ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির অনুরোধ
চট্টগ্রাম বন্দরের আন্দোলনরত ১৫ জন কর্মচারীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরকে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সই করা এক চিঠিতে এসব আবেদন জানানো হয়। চিঠিটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে। এর অনুলিপি দেওয়া হয়েছে নৌপরিবহন উপদেষ্টার দফতর, দুদক এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালকের কাছেও। বন্দরে লাগাতার কর্মবিরতি স্থগিতের ঘোষণার পর এ চিঠি দেওয়া হয়।
চিঠিতে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহিম খোকন। এর আগে তাদের প্রেষণে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়। তালিকার অন্যরা হলেন— মো. ফরিদুর রহমান, মোহাম্মদ শফি উদ্দিন, রাশিদুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. জহিরুল ইসলাম, খন্দকার মাসুদুজ্জামান, মো. হুমায়ুন কবীর (এসএস পেইন্টার), মো. শাকিল রায়হান, মানিক মিঝি, মো. শামসু মিয়া, মো. লিয়াকত আলী, আমিনুর রসুল বুলবুল ও মো. রাব্বানী।
চিঠিতে বলা হয়েছে, উক্ত কর্মচারীগণ রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত। এ সকল বিপথগামী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বর্তমানে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তারা যেন দেশত্যাগ করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দফতর ও এজেন্সিকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো।
এ ছাড়া শুধু দুদকের জন্য অংশে বলা হয়েছে, বর্ণিত কর্মচারীদের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।
আইকে/এফএ